যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার মামলায় বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

প্রতারণার করার অভিযোগে গত মে মাসে এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। শিক্ষার্থীর ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসা চাঁদপুরের সন্তান আবু নাসের হোসেন নিজেকে মার্কিন নাগরিক হিসেবে দাবি করে পাসপোর্টের আবেদন করেছিলেন। আর এমন প্রতারণার অভিযোগেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিউ ইয়র্কের বাফেলো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির পর ২০০১ সাল পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন আবু নাসের। 

২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘প্রোফাউন্ড র‌্যাডিয়েন্স ইনক’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন আবু নাসের। ট্যাক্স এ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সার্ভিসের এই প্রতিষ্ঠানের সিইও এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। এসময় তিনি বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে ভিসা সংগ্রহ করেন। 

২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডিসি থেকে একটি পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন। সে সময় জমাকৃত আবেদনে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন বলে উল্লেখ করেন আবু নাসের। একই বছরের ২৮ এপ্রিল তিনি উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী হিসেবে আই-৫২৬ ফরমে আবেদন করেন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টে। সেখানেও নিজেকে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। 

সেখানে আবু নাসের বলেন, ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর ২০০৩ সালের মে মাসে তিনি ইউনিভার্সিটি ত্যাগ করেন। এরপর একটি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। তার জন্য ওই কোম্পানি দুইবার তার জন্য ‘পারমানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন’র আবেদন করে। কিন্তু দুইবারই তা নাকচ হয়। এরপরই তিনি নিজেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট তার আই-৫২৬ আবেদনও অগ্রাহ্য করেছে। 

ফেডারেল কোর্টে দায়েরকৃত মামলায় আবু নাসেরের প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যাবার অনুমতি চেয়েছিলেন আই-১৩১ ফরম পূরণের মাধ্যমে। এই ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট চাওয়ার সময়ে নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেন। পরের মাসে বিদেশ সফরের পর পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার আগ্রহ দেখান তিনি। সে আবেদনও নাকচ হয়। 

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর আবু নাসের ডিসিতে ইউএস পাসপোর্টের জন্যে আবেদন করেন। সে সময় তিনি নিজেকে ওয়াশিংটন ডিসিতে জন্মগ্রহণকারী হিসেবে দাবি করেন। এর প্রায় দুই বছর পর আবু নাসের ডিসি অথরিটির কাছে বিবৃতি দেন যে, তিনি সেখানকার জন্মগত নাগরিক। ২০১৫ সালের ২৪ নভেম্বর পুনরায় একই দাবি করেন তিনি। ২০১৭ সালের ১২ জুনেও আবু নাসের একই তথ্যের দিয়েছেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীসহ ফেডারেল গোয়েন্দাদের কাছে। 

গোয়েন্দারা তার কাছে নিশ্চিত হতে চান যে, এর আগে স্টুডেন্ট ভিসা ও ট্যুরিস্ট ভিসার জন্যে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে কয়েক বার আবেদন, এক পর্যায়ে স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসা এবং ডিসি থেকে আইডি লাভ করতে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে তথ্য-প্রমাণ জমা দেয়ার পরও কীভাবে নিজেকে জন্মগত আমেরিকান হিসেবে দাবি করছেন। আবু নাসের নিজের এ তথ্য স্বীকার করেননি। 

তার মা কখনই যুক্তরাষ্ট্রে না থাকা সত্ত্বেও তাকে স্বশরীরে উপস্থিতি দেখিয়ে নোটারি পাবলিকের স্বাক্ষর নিয়ে তা পাসপোর্ট দপ্তরে সাবমিটের ঘটনাও ঘটিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

বর্তমানে আবু নাসেরের জামিনের চেষ্টা চলছে। তবে অভিবাসনের মর্যাদা না থাকায় ফেডারেল কোর্ট থেকে জামিন লাভের পর আইস (ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) তাকে ডিটেনশন সেন্টারে নিতে পারে বলে ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নিরা মনে করছেন। 

আবু নাসেরকে কোর্টে হাজির করার পর বাংলাদেশ থেকে স্কাইপে তার ভাই সাক্ষী দিয়েছেন যে, তার বাবা-মা ১৯৭৫ সালে ভারত হয়ে জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। সেখানে তারা ৩ বছর বসবাস করেছেন। সে সময়েই আবু নাসেরের জন্ম হয়। তবে কোনও হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নয়; ধাত্রীর হাতে আবু নাসের জন্ম হয় বলে জানান তিনি। এরপর তাদের বাবা-মা অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে নবজাতক সন্তানসহ আবার জাহাজে করে অবৈধ পথেই বাংলাদেশে ফিরেছেন। সে দাবি আদায়ের জন্যই স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন আবু নাসের। আদালতে উপস্থিত তার শ্বশুরও একই ধরনের সাক্ষ্য দেন। সামনের মাসে এ মামলার পরবর্তী শুনানি বলে জানা গেছে। ওই পর্যন্ত তাকে কারাগারেই কাটাতে হবে।