ফোনের ডিসপ্লেতে একটা নামই ভেসে উঠছে বারবার,নীরু...

ফোনটা একনাগাড়ে বেজেই যাচ্ছে।ফোনের ডিসপ্লেতে একটা নামই ভেসে উঠছে বারবার,নীরু...

সেই সকাল ৬ টা থেকে মেয়েটা একটু পরপরই ফোন করে যাচ্ছে। ফোনের মালিক শ্রাবণ পাশেই বসে আছে। নীরুর কল দেখে তার হাত-পা একনাগাড়ে কাঁপাকাঁপি শুরু করে দিয়েছে। এমনিতে শ্রাবণ শক্তপোক্ত মানুষ। কিন্তু নীরুর বেলায়ই তার যত হাত-পা কাঁপাকাঁপি চালু হয়ে যায়। এই হাত-পা কাঁপাকাঁপির জন্য কয়েকদিন ঔষধও খেয়েছিলো সে। কাজ হয়নি উলটে আরো বেড়ে গেছে। নীরু মেয়েটাকে সে অসম্ভব রকমের ভয় পায়। নিজের চেয়ে ৫ বছরের ছোটো এই পুঁচকি মেয়েকে ভয় পাওয়ার কি আছে সেটাই ভেবে পায়না শ্রাবণ। সে আজকে পণ ধরেছে যাই হয়ে যাকনা কেন সে আজ নীরুর ফোন ধরবেই না। ফোন ধরলেই একটা ছোটোখাটো ঘুর্ণিঝড় সংঘটিত হবে ফোনের মধ্যেই। তাই ফোন না ধরাটাই শ্রেয় মনে হচ্ছে তার কাছে। কিন্তু ফোন না ধরে যে সে পার পেয়ে যাবে তা নয়। ফোন না ধরলে নীরু সোজা ওর বাসায় এসে পড়বে। তখন ছোটোখাটো সাইক্লোন বয়ে যাবে ওর সাজানো অগোছালো ঘরে। নীরু ঘরে আসলে যে সাইক্লোন টা হবে তার চেয়ে নিরুর সাথে ফোনে কথা বলায় যেই ঝড় হবে তাকেই বেশি ভয় পাচ্ছে শ্রাবণ। কাল রাতে সে এক বিশাল সাহসের সাথে একটা দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলেছে। এখন নীরু ওর কি অবস্থা যে করবে তা ভাবলেই মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে তার। তাই আপাতত কাথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। একটু পরেই বাইরে নীরুর আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। শ্রাবণের মা সম্পর্কে নীরুর খালামনি হয়। তাই এ বাড়িতে নীরুর আনাগোনা বেশি। নীরুর কণ্ঠ অসম্ভব মিষ্টি। যে কেউ শুনলে মুগ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন নীরুর কণ্ঠ শুনে শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেলো, হাত-পা কেমন যেন ঠাণ্ডা হয়ে অসাড় হয়ে যেতে লাগলো। আর হাত-পা কাঁপাকাঁপি? সেটা তো অটোমেটিক চালু। 
.
নীরু ঘরে এসে একবার চারপাশটায় চোখ বুলিয়ে নিলো। ঘরে কোনো জিনিসই তার জায়গায় নেই। সবকিছু অগোছালো। এতবড় গণ্ডারের মত বড় একজন মানুষ এত অগোছালো কিভাবে হতে পারে? এই লোক কিভাবে ডিফেন্সে চাকরি পেয়ে গেলো তাও ভেবে কূল পায়না নীরু। উপরস্থ কর্মকর্তারা কি পাগল টাগল হয়ে গেলো নাকি কে জানে, এই গাধার মত লোককে ওরা কিভাবে ডিফেন্সে জব দিলো। শ্রাবণকে গাধা বলার ১০০% একটা খাপেখাপ কারণ আছে নীরুর। এখন বসন্ত কাল, আর এই গাধা লোকটা কাথামুড়ি দিয়ে ঘুমুচ্ছে। নীরুকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয়ে গলাটা শুকিয়ে গেলো শ্রাবণের। খুব বড় ভুল হয়ে গেছে তার।আগে আগেই পানি পান করে নেওয়া উচিত ছিলো। নীরু এগিয়ে আসছে তার দিকে। কাথার নিচ দিয়ে দেখা যাচ্ছে সবকিছু। নীরু এক পা এক পা করে আসছে এদিকে। নীরু কাথাটা উঠিয়ে ফেললেই বুঝে যাবে সবকিছু। তখন আর রক্ষে নেই শ্রাবণের। নীরু যেই না কাঁথায় হাত দিবে ঠিক তখনই একটা হাই তুলে ওপাশ ফিরলো শ্রাবণ। আর নিজেকে মনেমনে বলছে,
-"বাহ শ্রাবণ, এত ভালো এক্টিং পারিস তুই। তোকে তো অস্কার দেওয়া প্রয়োজন।"
নীরু আর কিছু বলেনি। নিশ্চয়ই ভেবে নিয়েছে শ্রাবণ ঘুমুচ্ছে। তবে ও টেবিলের উপরে কি যেন করছে। শ্রাবণ দেখতে পাচ্ছেনা। নীরু চলে যেতেই এক লাফে চলে গেলো টেবিলের কাছে। বক্স চাপা দেওয়া একটা ছোট্ট কাগজ। কাগজটা দেখে হাত-পা থরথর করে কাঁপতে শুরু করলো তার। এবার হাত-পা কাঁপাকাঁপি ভয়ের কারণে নয়, এবার কাঁপছে রাগে। শ্রাবণ নীরুর সাথে ভয়ানক রাগ করেছে। 
.
কাল রাতে শ্রাবণ চুপিচুপি একটা চিরকুট লিখে নীরুর বালিশের নিচে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলো। ভেবেছিলো নীরু চিঠিটা পড়ে একটা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখাবে। নিউটনের সুত্র অনুসারে প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত ক্রিয়া রয়েছে। শ্রাবণ কাল রাতে এতবড় একটি ক্রিয়া করলো অথচ নীরু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালোনা আজব তো। আবার বিকেলে রেস্টুরেন্টে দেখা করতে বলেছে। শ্রাবণ প্রথমে ভেবেছিলো যাবেনা। কিন্তু নীরুকে জিজ্ঞেস করতে হবে সে কেন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। জিজ্ঞেস করতে হলে দেখাও করতে হবে। আর দেখা করতে হলে রেস্টুরেন্টে যেতেই হবে।
.
বিকেল ৩ টা। চিলি'স নামক রেস্টুরেন্টে বসে আছে শ্রাবণ। নীরু এখনো আসেনি তাই ম্যাংগো জুস খাচ্ছে আর নীরুর অপেক্ষা করছে। হঠাৎ নীরুর আগমন। সিঁদুররাঙা পাড়ের একটা সবুজ শাড়ি পড়েছে মেয়েটা। নীরু এসে শ্রাবণের উল্টোদিকে বসলো। আর হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করার সময় নীরুর হাতে পরা লাল চুড়িগুলো একটি আরেকটির সাথে ধাক্কা খেয়ে রিনঝিন আওয়াজ করে উঠলো। সেই আওয়াজ যেন শ্রাবণের বুকে সুনামি বইয়ে দিলো। আর সাথে অটোমেটিক হাত-পা কাঁপাকাঁপি তো আছেই। শ্রাবণের বলতে ইচ্ছে করলো,
-"ওহে নীরু,তুমি কি কখনো সবুজ পাতায় মোড়ানো লাল গোলাপ দেখেছো? যদি না দেখে থাকো তাহলে একটু ওই আয়নার সামনে যাও প্লিজ। একটু যাও।"
.
নীরু কোনো বাহানা ছাড়াই প্রথমে বলল, 
-"ওই চিরকুটের মানে কি শ্রাবণ ভাই?"
শ্রাবণের ইচ্ছা করলো বলতে,
-"এই মেয়ে এই, খালাতো ভাই বলে প্রতি লাইনে লাইনে ভাই বলতে হবে তোর? একেবারে চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো।"
মনে এটা বললেও মুখে বলল,
-"কোন চিরকুটের কথা বলছো তুমি?"
নীরু এবার টেবিলে একটা থাপ্পড় দিয়ে ধমকের সুরে বলল,
-"না বোঝার ভান করবেনা একদম।কালকে ওসব কি লিখে আমার বালিশের নিচে রেখেছো? আর তারপরেও যদি চিনতে না পারো কোন চিরকুটের কথা বলছি তাহলে ওইযে তোমার হাতে যেই চিরকুটটা আছে সেটার কথাই বলছি আমি।"
শ্রাবণ অবাক হওয়ার মত করে বলল,
-" ও.. এই চিরকুটের কথা বলছো তুমি? হাহা এটা তো নামতা লিখে দিয়েছি তোমাকে। বাচ্চাদেরকে পড়াবে।"
এতে নীরুর রাগ আরো বেড়ে গেলো। সে এবার একটা কাঁটাচামচ শ্রাবণের গলা বরাবর তুলে ধরে বলল,
-"তুমি কি ভেবেছো আমি বুঝিনি কি বলেছো তুমি?" 
এবার ঢোক গললো শ্রাবণ।তবুও দমে না গিয়ে একটু জোরেই বলল, 
-" হ্যাঁ আর তুমি যে আমার চিরকুট আমাকেই ফেরত দিলে সেটা কি?"
এবার নীরুর মুখে হাসি ফুটলো। এ হাসি সে হাসি নয়,এ হাসি শয়তানি হাসি।প্রায় দু'মিনিট এমন শয়তানি হাসি হেসে একটা কাগজ তুলে ধরলো শ্রাবণের সামনে।কাগজটায় লেখা,
-"একটি পাখি,চারটি পাখি,তিনটি পাখি।"
.
এবার শ্রাবণের অবাক হওয়ার পালা। এটাই তো সেই চিরকুট যা সে কালকে নীরুর বালিশের নিচে রেখেছিলো। কিন্তু এটা তো নীরুর হাতে। এটা যদি নীরুর হাতে থাকে তাহলে তার হাতের চিরকুটটা কার লেখা? ভাবতেই দ্রুত নিজের হাতে রাখা চিরকুটটা খুললো। যা সন্দেহ করেছিলো তাই। নীরু তাকে বোকা বানিয়েছে। এভাবে কেউ কাউকে বোকা বানায়? কি দরকার ছিলো এভাবে তাকে বোকা বানানোর? ভাবতেই কান্না এসে গেলো শ্রাবণের। অল্প কারণেই ভ্যা ভ্যা করে কেদে দেয় শ্রাবণ। এটা তার একটা বদ অভ্যাসের মধ্যে অন্যতম একটা। এখন নীরুর সামনে কেঁদে দিলে প্রেস্টিজের বারোটা বেজে যাবে।
.
শ্রাবণের টলমল চোখ দেখে নীরুর রাগ আবারো বেড়ে গেলো। বলল,
-"তোমার মত গাধা যে কীভাবে খালামনির মত ভালোমানুষের গর্ভে জন্মালো আল্লহই জানে। তুমি কিভাবে সেনাবাহিনিতে জব পেলে বলোতো আমাকে? এমন গাধা কেউ হয়? এখন ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে দিচ্ছো কেন? মাইর খেতে চাও আমার হাতে?"
শ্রাবণের কান্নাটা গলায়ই আটকে গেলো।এখন কথা বলতে গেলে সত্যিই কেঁদে দেবে সে। তাই সে আবার ম্যাঙ্গো জুস খাওয়ায় মনোযোগ দিলো।
.
নীরু এক মিনিটের মত শ্রাবণকে পর্যবেক্ষণ করলো। শ্রাবণ জুস খাচ্ছে তো খাচ্ছে। যেন জীবনেও জুস খায়নি।
-"আচ্ছা আমার খালামনির কি টাকার অভাব পড়েছে যে তুমি তার টাকা না খেয়ে আমার টাকা কেন খাচ্ছো?"
নীরুর কথায় যেন তাচ্ছিল্য মেশানো ছিলো। নীরু কি তাকে অপমান করছে? হাউ ডেয়ার শি.. ভাবতে ভবতেই ওয়েটারকে ডাক দিলো সে। বিল এসেছে ৫০০ টাকা। শ্রাবণ পুরো এক হাজার টাকার নোট ওয়েটারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-"বাকিটা তোমার টিপস।"
বলে হনহন করে বেড়িয়ে গেলো সে। কিছুক্ষণ পরেই হুশ হলো রাগের মাথায় নীরুকে ফেলে রেখেই চলে এসেছে সে। ইশ নীরুর সাথে আরও কিছুক্ষণ সময় কাটানো যেতো।এমন সুযোগ সচরাচর হয়না। এখন কি ফেরত যাবে সে? যাওয়াটা কি ঠিক হবে? নীরু কি তাকে বেহায়া বলবে? যা বলবে বলুক। তবুও সে যাবে ভেবে পেছন ফিরতেই নীরুর সাথে ধাক্কা।
-"চোখের কি মাথা খেয়েছো নাকি? এখন যদি আমি পরে যেতাম? যদি আমার হাত ভেঙে যেতো? তার দায় কি তুমি নিতে? হ্যাঁ? "
শ্রাবণ হঠাৎ করেই বলে ফেলল,
-"আমি তোমার সব দায় নিতে চাই নীরু৷ আমি তোমাকে ভালোবাসি। I Love You।"
.
কথাটা বলার পর হুশ ফিরলো শ্রাবণের। এ কি বলে ফেলেছে সে! এখন যদি নীরু রাগ করে? যদি আর কথা না বলে? যদি আর রাগ না দেখায়? নীরুর রাগকে ভয় পেতে পেতে রাগটাকেও ভালোবেসে ফেলেছিলো সে। নীরু রাগলে ওর নাকটা লাল হয়ে যায় আর চোখগুলো অটোমেটিক বড়বড় হয়ে যায়। সেই বড়বড় চোখের দিকে তাকালে নিমিষেই ডুবে যায় শ্রাবণ। ভালোবাসার মানুষের রাগ কেন, সে যদি মেরেও ফেলে তখনও হাসতে হাসতে মরে যাওয়া যায়। নীরু চাইলে শ্রাবণ হাসতে হাসতে নিজের মরণ বরণ করবে তবুও নীরুর অবহেলা আর নিশ্চুপতাকে সইতে পারবেনা। নীরুর মুখ দেখে তার মতিগতি বোঝা যাচ্ছেনা। কি চাচ্ছে সে? 
.
বেশ খানিকক্ষণ পর নীরু বলল,
-"এতদিনে সাহস হয়েছে সাহেবের? সব দায় যখন নিতেই চাও তখন আমি কিছু জানিনা। যা জানানোর তা আমার খালামনি আর তোমার খালামনিকে জানাও। "
বলেই শয়তানি হাসি হাসলো নীরু। নীরু ইচ্ছে করেই শ্রাবণকে বিপদে ফেলতে চাচ্ছে। শ্রাবণ যদি সত্যিই দায়িত্ব নিতে চায় তাহলে পাকাপাকিভাবেই নিক। 
-"আশাকরি খুন দ্রুত বিয়ের সানাই বাজবে তোমার। আমি অপেক্ষায় থাকবো।হুহ,, আমার এত কিসের শখ। নেহাৎ তুমি বললে তাই দয়া করে রাজি হয়ে গেলাম। আর হ্যাঁ তোমার ওসব পাগলামি কথাবার্তা আর চিন্তাভাবনা বাদ দাও। তোমার সাজানো অগোছালো ঘরে আমি যাবোনা। পাগলের মত ইচ্ছে করে ঘরকে এমন অগোছালো রাখো কেন? তুমি কি জানো তোমার মাথার একটা তার ছিড়ে গেছে?"
শ্রাবণ হেসে হেসে জবাব দিলো,
-"হ্যাঁ জানি, এইযে তুমি বললে।"
-"কি বলেছি মনে থাকবে? আজই গোছানো অগোছালো ঘরকে গুছিয়ে ফেলবে বলে দিলাম। নয়ত কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে সারাদিন। "
এই বলে রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলো নীরু। ওদিকে শ্রাবণ মহাবিপদে। এখন নীরুকে বিয়ে করার কথা কিভাবে বাসায় জানাবে সে? 
.
বাসায় ফিরতেই শ্রাবণের বাবা তার হাতে একটা শেরওয়ানী ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
-"যা বাবা তৈরি হয়ে আয়।নীরুকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসছে। হয়ত আজই বিয়ে হয়ে যাবে। দ্রুত তৈরি হয়ে আয়। আমরা স্পেশাল গেস্ট। "
বাবার কথা শুনে শ্রাবণের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। নীরু তাকে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেনা। নীরুদের বাসায় পৌছেই আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা নীরুর রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো শ্রাবণ। নীরুর দিকে তাকিয়ে দেখলো ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কাজল পড়ছে। 
-"ইশ! বরের জন্য এত সাজা হচ্ছে। যদি অন্যকেই বিয়ে করবি তাহলে বিকেলে আমাকে ওসব বললি কেন শয়তান মেয়ে? তোর সাজ আমি ছুটাচ্ছি।"
মনেমনে এসব বলতে বলতেই নীরুকে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সাথে চেপে ধরলো শ্রাবণ। তারপর বলল,
-"তুই আমাকে কেন ঠকালি।"
নীরু শান্তস্বরে জবাব দিলো,
-"আমি তোমাকে ঠকাইনি। তুমি এতদিন ধরে আমাকে ভালোবাসো সেটা আজকে আমাকে বললে কেন? আর আমাকে বলার আগে নিজের বাবা মাকে বললেনা কেন? এখন আমার অন্যকোথাও বিয়ে হয়ে গেলে আমার আর কি করার থাকতে পারে? সরো ছাড়ো আমাকে। ওরা এসে পড়েছে।"
রাগে দুঃখে শ্রাবণের কান্না পেয়ে গেলো। নীরুকে ছেড়ে দিয়ে এবার নীরুর বিছানায় বসে পড়লো সে। নীরু চোখে কাজল দেওয়া শেষে শ্রাবণের কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বলল,
-" আহা,মন খারাপ করেনা শ্রাবণ ভাই। সবার সব চাওয়া পূরণ হয়না। তুমি আমার চেয়ে ভালো মেয়ে পাবে দেখো।"
এটুকু বলে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেলো নীরু। আর শ্রাবণ সেখানেই বসে রইলো পাথরের মত। সে মনেমনে পণ ধরেছে নীরু যেই মুহূর্তে কবুল বলবে সেই মুহূর্তে হাতের রগ কেটে মরে যাবে সে। রাখবেনা এই জীবন। নীরুকে ছাড়া তার জীবন তরকারী বিহীন লবণের মত থুক্কু লবণবিহীন তরকারির মত। মরে যাবে শ্রাবণ, একদম মরে যাবে।
.
কাজী এসে গেছে। এক্ষুণি বিয়ের কার্যক্রম শুরু হবে। নীরুর বর নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর তাই শ্রাবণকে না দেখে তারকাছে নীরুকে দিচ্ছে তার বাবা মা। আরে ওই গরুর চেয়ে শ্রাবণ কোন অংশে কম ছিলো? এভাবে মানুষটার মন ভাঙার কোনো দরকার ছিলো নাকি? 
ভাবতে ভাবতে চোখের জল ফেলতে লাগলো শ্রাবণ। কাজী বলছেন,
-"বলো মা কবুল।"
সাধারণত বিয়েতে কনে একটু দেরি করে কবুল বলে।নীরুও তাই। পাক্কা ৫ মিনিট লাগিয়ে কবুল বলল নীরু। নীরু এখন অন্য কারো। শ্রাবণ আর এ জীবন রাখবেনা। একটা ছুড়ি খুজছে সে। ছুড়ি পেয়েও গেলো একটা। যখনই ছুড়িটা হাতে বসাবে তখনই হুড়মুড় করে সবাই নীরুর রুমে প্রবেশ করলো। আর শ্রাবণ ছুড়িটা লুকিয়ে ফেলল। শ্রাবণ সবচেয়ে বেশি অবাক হলো তখন যখন দেখলো কাজী তার সামনে বসে বলল,
-"মোহাম্মদ আহাদ চৌধুরীর একমাত্র পুত্র শ্রাবণ চৌধুরীর সাথে নাঈম আহমেদের একমাত্র মেয়ে আফরিন নীরুর এক লাখ এক টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে আপনি যদি রাজী থাকেন তাহলে বলুন বাবা, কবুল।"
শ্রাবণ প্রায় দশ মিনিটের মত হতভম্ব হয়ে সবার মুখের দিকে চেয়ে ছিলো। নীরুকে দেখলো পাশেই মিটিমিটি হাসছিলো। 
.
-"তোমার মত গাধা ছেলে আমি একটাও দেখিনি শ্রাবণ ভাই। আর আমার বিয়েএ মত অদ্ভুত বিয়েও আমি আর দুটো দেখিনি। সাধারণ বিয়েতে প্রথমে বর কবুল বলে আর কনে সবার শেষে দেরি করে কবুল বলে। আর আমার বিয়েতে? কনে আগে কবুল বলেছে আর কম সময়ে বলেছে। আর বর বেশি সময় লাগিয়ে শেষে কবুল বলেছে।হাহাহা।"
শ্রাবণ রুমে ঢুকতেই নীরু ওকথা বলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর শ্রাবণ দেখছে সেই হাসি। নীরুর ওপর শ্রাবণের আর কোনো রাগ নেই। একটু কষ্টের বিনিময়ে যদি নীরুকে পাওয়া যায় তাহলে সেই কষ্টের গুলিতে ঝাঁঝরা হতেও প্রস্তুত আছে শ্রাবণ। তবে শ্রাবণের এখন প্রচুর ভয় করছে, ভয়ে হাত-পা কাঁপাকাঁপি চালু হয়ে গেছে আবার। হেঁটে হেঁটে ফুলে সাজানো বিছানার কাছে যাওয়ার মত শক্তিটুকুও যেন নেই তার মধ্যে। হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে তার। শ্রাবণের এই অবস্থা দেখে নীরু নিজেই হেঁটে এলো শ্রাবণের কাছে। তারপর একটা কাগজ উঁচু করে তুলে ধরলো। হাতের মুঠোয় থাকার কারণে কুঁচকে গেছে কাগজটা। তবুও শ্রাবণ লিখলো কাগজটায় তার নিজেরই হাতের লেখা।
-"একটি পাখি,চারটি পাখি,তিনটি পাখি।"
নীরু দুষ্টুমি হাসি দিয়ে বলল,
-"বলোতো এটার মানে কি?"
শ্রাবণ লজ্জা পেয়ে হেসে বলল,
-"তুমি তো জানো,তুমিই বলো।"
নীরুও লজ্জার মত ভঙ্গি করে বলল,
-"বলবো? সত্যিই? লজ্জা পাবে না তো?"
-"আরে নাহ,লজ্জার কি আছে? বলো আমি শুনছি।"
এবার নীরু আরেকটু লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে ফিরে বলল,
-" তুমি কিভাবে জানো যে আমার খুব শখ মুরগী পোষার? তুমি আমাকে প্রথমে একটি মুরগী এনে দিবে। আমি সেটা পুষবো তারপরও সেটা বাচ্চা দিলে চারটি মুরগী হয়ে যাবে। আর সেখান থেকে একটি মুরগী আমরা খেয়ে ফেলবো।তখন হয়ে যাবে তিনটি। আমি ঠিক বলেছি তাই না?"
শ্রাবণের কোনো উত্তর নেই। নীরু পেছন ফিরে দেখলো শ্রাবণ বেঁহুশ হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। এবার নীরু মনেমনে বলল,
-"আমি তো দুষ্টুমি করেছিলাম শ্রাবণ ভাই। তুমি বুঝলে না? অজ্ঞানই হয়ে গেলে? থাক,তবুও শোনো I love you too। আমাদের বিয়েটা খুব অদ্ভুত তাইনা? হাহাহা।"

গল্পঃবিয়ে
লেখাঃজান্নাত
.
(সমাপ্ত)