সাকিবের লাশ চোখের সামনেই ফ্লোরে পরে আছে। লাশের আশপাশ রক্তে

সাকিবের লাশ চোখের সামনেই ফ্লোরে পরে আছে। লাশের আশপাশ রক্তে গাঢ় লাল রঙ ধারণ করেছে। মানুষ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লাশের দিকে। লাশ দেখে সবার শরীর শিউরে উঠছে। পুরো শরীরে নখের আচড়ে চামড়া ছিঁলে রক্তাত হয়ে গেছে। ঘাড় থেকে মাথাটা পিছন দিকে ঘুরানো। সাকিব যেন শরীর না ঘুরিয়ে মাথা পিছনে নিয়ে তাকিয়ে আছে। ঘাড়ের রগে দুইটা দাত বসানোর চিহ্ন ফুটে উঠেছে।

সাকিবের বাসার দোতলা ছাদের চিলেকোঠায় লাশ পরে ছিল। নিজেদের বাসায় ছেলের এহেন মৃত্যু সাকিবের মা মেনে নিতে পারছে না। আর্তনাদ করে বলছে, " আমি বাসায় থাকতেও কিভাবে আমার সাকিবের এমন হলো? "। সাকিবের আম্মুর এমন কথা শুনে আমি বেশ অবাক হলাম। এভাবে নির্মমভাবে বাসায় সাকিবের মৃত্যু হল অথচ চিৎকার, চেঁচামেচির আওয়াজ আন্টি শুনল না!

সাকিব আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। শৈশব থেকে একই সাথে বেড়ে ওঠা আমাদের। হঠাৎ করেই সাকিবের এমন মৃত্যু আমরা কেউ-ই মেনে নিতে পারছি না। বন্ধুদের মধ্য সাকিব একটু বেশিই চঞ্চল টাইপের ছিল। কিন্তু, তার এই চঞ্চলতা এখন আর আমাদের কারো চোখেই পরবে না!

একে একে আমাদের সব বন্ধু সাকিব কে দেখতে চলে আসল। হাসিব, সাঈম আগেই চলে এসেছে। শুভ, শাওন, সুপ্তি, তিথি মাত্রই এলো। সাত বন্ধুর মধ্যে সাকিব অকালে আমাদের ছেড়ে চলে গেল। ভাবতেই চোখের কোণে জল গড়িয়ে পরে।

" কি বিভৎস দেখাচ্ছে সাকিবের লাশ! " সুপ্তি বলে পাশে থাকা চেয়ারে বসল। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করল; " কে এমন ভাবে মারল? সাকিবের তো কোন শত্রু ছিল না! "। এই প্রশ্নের উত্তর তো আমার ও অজানা। তাই চুপ করেই রইলাম।

থানার ওসি আরিফ সাহেব এসে সাকিবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দিলেন। ক্লু সংগ্রহের জন্য চিলেকোঠার রুম ভালোভাবে দেখতে লাগল। পুরান কিছু আসবাবপত্র ছাড়া রুমেই আর কিছুই ছিল না। পুরো রুম খুঁজে আরিফ সাহেব ক্লু সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হল।

আরিফ সাহেব সাকিবের আম্মুকে জিজ্ঞাসা করলেন; " আপনার ছেলের কিংবা আপনাদের পরিবারের কোন শত্রু ছিল? "। সাকিবের আম্মু কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন; " আমাদের কোন শত্রু নেই! সাকিবের ও শত্রু থাকার কথা নয় "। ওসি এবার জিজ্ঞাস করলেন; " সাকিবের বন্ধুবান্ধব কারা? "। আন্টি আশেপাশে তাকিয়ে আমাদের ছয় জন কে একই সাথে দেখতে পেয়ে হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলেন।

আরিফ সাহেব কাছে এসে জিজ্ঞাস করলেন; " তোমরা সাকিবের বন্ধু? "। আমি মাথা নাড়িয়ে 'হ্যা' সূচক জবাব দিতেই বলল; " তোমরা ছয় জন বিকেলে থানায় এসে আমার সাথে দেখা করবে!"। কথাটা বলে তিনি বের হয়ে গেলেন।

বিকেল গড়াতেই ছয় জন থানায় উপস্থিত হলাম। সুপ্তি, তিথির চোখেমুখে ভয়ের ছাপ দেখতে পেয়ে অভয় দিয়ে বললাম; " ভয়ের কিছুই নেই! হয়তো কিছু জানার জন্য ডেকেছে "। আরিফ সাহেব সবাইকে ভিতরে যেতে বললেন। ভিতরে ডুকতেই মুচকি হেসে আরিফ সাহেব বললেন; " বাহ! বেশ তো। তোমরা এসে পরেছ। বস তোমরা! "।

আরিফ সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করলেন; " তোমার নাম? "। আমি বললাম; আমি আলভী। আরিফ সাহেব একে একে সবার পরিচয় জেনে নিলেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞাসা করলেন; " সাকিবের সাথে কারো শত্রুতা ছিল? "। সুপ্তি বলল; " না স্যার, আমাদের জানা মতে সাকিবের সাথে কারো এমন কিছুই হয়নি যার জন্য শত্রুতা তৈরি হবে "। আরিফ সাহেব হাসিব কে জিজ্ঞাস করল; " সাকিবের সাথে কোন মেয়ের সম্পর্ক ছিল? "। হাসিব বলল; " আমরা যতদূর জানি, সাকিব কোন মেয়ের সাথেই সম্পর্কে জড়ায়নি! "।

আরিফ সাহেব আমাদের ছয় জনের কন্ট্রাক্ট নাম্বার, বাসার ঠিকানা লিখে রাখলেন। সবার উদ্দেশ্যে বললেন; " কথা বলে বুঝতে পারলাম সাকিব তোমাদের খুব ভাল বন্ধু ছিল। তার মৃত্যুতে তোমরা ভেঙে পরেছ তা তোমাদের দেখলেই বোঝা যায়। কেসের জন্য যে কোন সময় তোমাদের হ্যাল্পের প্রয়োজন হতে পারে! আশাকরি, তোমাদের বন্ধুর খুনিকে ধরার জন্য তোমরা আমাকে সাহায্য করবে! "। এখন তোমরা আসতে পার।

থানা থেকে বের হয়ে আমরা চলে আসলাম। আসার সময় শাওন বলল; " আমার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে সাকিব কে মার্ডার করা হয়নি "। সাগর জিজ্ঞাস করল; " মার্ডার নয় কেন? "। কারণ, সাকিবের শরীরে নখের আঁচড়ের দাগগুলো অদ্ভুত লেগেছে আমার কাছে"। সুপ্তি বলে উঠল; " শাওন ঠিক বলেছে, আঁচড় একটু বেশিই ডিপ হয়েছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা অনেক বড় নখের আঁচড়"।
আমি বললাম; ঘাড় মচকানো আমার কাছে বেশ অদ্ভুত মনে হয়েছে। মাথাটা কিভাবে মচকিয়ে উলটো কর হয়েছে!"।

সাকিবের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো বড্ড বেশিই মনে পরছে। স্কুল, কলেজ, পার করে ভার্সিটিতে একই সাথে ভর্তি হয়েছিলাম। কতোই না সুন্দর ছিল আমাদের বন্ধুত্ব! আজ তা সবই স্মৃতি!
মোবাইলের রিংটোনে ভাবনায় ছেদ পরল। মোবাইলের স্কিনে তাকিয়ে দেখি সুপ্তি কল দিয়েছে। কল রিসিভ করে করতেই সুপ্তি বলল;

-- আলভী তুই কোথায়?

-- কেনো? বাসায় আমি।

-- না এমনিই। ভালো লাগছে না। সাকিবের লাশ চোখে ভেসে উঠছে!

-- তুই তো লাশ দেখছিস। আর আমার চোখে তো স্মৃতি ভাসছে!

-- আলভী, কেনো জানি সাকিবের মৃত্যুটা আমার কাছে অদ্ভুত টাইপের মনে হচ্ছে।

-- কেমন অদ্ভুত?

-- না মানে। এটা মানুষের খুন হতে পারে না। আমার কাছে ব্যাপারটা ভৌতিক মনে হচ্ছে।

-- কি যাতা বলছিস! ভূত-প্রেত বিশ্বাস করিস নাকি?

-- আগে তো করতাম না। কিন্তু, সাকিবের লাশ দেখার পর থেকে কেমন যেন ভয় লাগছে।

-- আরে বাদ দে তো ওসব চিন্তা। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসলেই বোঝা যাবে।

-- হ্যা, তার জন্যই তো অপেক্ষা করছি।

-- তুই একদম ই এসব ভূত-প্রেত নিয়ে ভাবিস না। তাহলে রাতে উলটা পালটা কিছু ঘটতেও পারে।

-- তুই একদম ই মজা করবি না। ভাল্লাগেনা এসব। ফোন রাখলাম!

সুপ্তি কল কেটে দিল। আমার ও ভাবনায় সাকিবের মৃত্যুর রহস্য ঘুরপাক খাচ্ছে। মৃত্যুটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। যারা সাকিবের লাশ দেখতে এসেছিল সবার কাছেই মৃত্যুটা অস্বাভাবিক লেগেছে। কেউ কেউ তো বলছে এটা কিছুতেই মানুষের কাজ হতে পারে না! লাশ দেখে এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক কিছুই না। মৃত্যু যেভাবেই হোক। কারণ তো একটা আছেই। কি হতে পারে সেই কারণ?

রাত বারোটা বেজে গেছে অথচ আমার চোখে ঘুম নেই! সাকিবের মৃত্যুর পর থেকে কেমন যেন এক অস্থিরতা কাজ করছে। কোন ভাবেই মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না! হঠাৎ মোবালেই রিং বেজে উঠল। কল রিসিভ করতেই ওপর পাশ থেকে বলল;
- হ্যালো আলভী?

- জ্বী, কে বলছেন।

-- আমি ওসি আরিফ।

-- ও আচ্ছা, স্যার বলুন!

-- কাল ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসবে। সাকিবের মৃত্যু আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে। কিভাবে সাকিব মরেছে তা কাল-ই জানতে পারব।

-- তাহলে তো ভালই হবে। সব প্রশ্নের উত্তর কাল রিপোর্ট দেখলেই পাওয়া যাবে।

-- হ্যা সেটাই আশা করছি। রিপোর্ট হাতে আসলে আমি তোমায় ফোন দিব। তুমি একবার থানায় এসো।

-- অবশ্যই স্যার!

-- আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে কাল দেখা হচ্ছে.....

আরিফ সাহেব কল কেটে দিলেন। এখন একটু হলেও অস্থিরতা কম মনে হচ্ছে। সাকিবের অদ্ভুত মৃত্যুর কিভাবে হয়েছে তা কাল জানতে পারব। সবাই হয়তো মুখিয়ে থাকবে রিপোর্টের আশায়!

 

                                                          ২য় পর্বঃ 

আমি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ঠিক সেই সময় রুমে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে পাশে থাকা টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে উঠে বসলাম। ল্যাম্পের মৃদু আলোয় দেখলাম একটি মানুষের অবয়ব আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম। শরীর দিয়ে ঘাম ঝড়তে লাগল। অবয়বটির একটি হাত আমার দিকে এগিয়ে আসছে। লোমশ হাতটি যতই আমার দিকে এগিয়ে আসছে ততই আমার শরীর ভয়ে কাঁপন দিচ্ছে। হাতের নখগুলো তিন ইঞ্চির মত হবে। এত বড় নখ মানুষের হাতে থাকার কথা নয়! আমি চিৎকার দিব কিন্তু চিৎকার দিতে পারছি না। অবয়বটি যখন আমার কাছে চলে আসল তখন ল্যাম্পের আলোয় তার বিভৎস চেহারা আমার চোখে পড়ল! আগুনে দগ্ধ হওয়া চেহারায় চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করছে। উপর চোয়ালের দুটো চিকণ চিকণ লম্বা দাঁত বেড়িয়ে আছে। সামনে থাকা অবয়বটি আমার গলা চেপে ধরল। আমি প্রাণপণে ছোটবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। হাতের বড় বড় নখ গুলো আমার গলায় দেবে যাচ্ছে। আমার গোঙানির আওয়াজ কারো কানেই যেন পৌছাচ্ছে না! চিকণ চিকণ লম্বা দাঁত গুলো আমার ঘাড়ের শিরায় কামড় বসিয়ে দিতেই........

আমি চিৎকার দিয়ে উঠে বসলাম। চিৎকার শুনে আম্মু দৌড়ে এসে দরজায় কড়া নাড়ছে। লাইট জ্বালিয়ে দরজা খুলে দিতেই আম্মু জিজ্ঞাস করল;

-- কিরে বাবা, কি হয়েছে? চিৎকার করলি কেন?

আমি রুমের চারদিক ভালো করে দেখছি। আমাকে ঘেমে যেতে দেখে আম্মু পুনরায় জিজ্ঞাস করল;

-- কিরে বাজে স্বপ্ন দেখেছিস?

আমি মাথা নাড়িয়ে ' হ্যা ' সূচক জবাব দিতেই আম্মু বলল;

-- তুই বোস! আমি পানি নিয়ে আসছি......

কি বাজে স্বপ্নই না দেখলাম! সাকিবের মৃত্যু নিয়ে বেশি ভাবায় হয়ত এমন স্বপ্ন দেখেছি। আচ্ছা, সাকিবের সাথে এমনটি হয়নি তো! ধুর, কি যাতা ভাবছি। আম্মু পানি এনে দিয়ে বলল;

-- ভোর রাতে কি এমন বাজে স্বপ্ন দেখেছিস?

-- আম্মু, এখন না সকালে বলব!

-- আচ্ছা ঠিক আছে সকালেই বলিস। এখন ঘুমিয়ে পর....

-- আচ্ছা ঠিক আছে।

আম্মু দরজা লাগিয়ে দিতে বলে চলে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি তিনটে চব্বিশ বাজে। এখন ঘুমাতেও কেমন যেন ভয় লাগছে। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে গেছে! কোন রকম রাতটা কাটিয়ে দিলাম। ভয়ে একটুও ঘুমোতে পারিনি!

সকালে আরিফ সাহেব ফোন দিয়ে থানায় যেতে বললেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তার হাতে এসে পৌঁছেছে। সকালের প্রাতরাশ সেরে থানার উদ্দেশ্য বেড়িয়ে পরলাম। থানায় গিয়ে দেখি আরিফ সাহেব বসে আছেন। আমাকে দেখে চেয়ারে বসতে বললেন। আরিফ সাহেবের মুখে বিষণ্ণতার ছাঁপ স্পষ্টত! আমি জিজ্ঞাস করলাম;

-- স্যার, রিপোর্ট পেয়েছেন?

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আরিফ সাহেব বললেন;

-- হ্যা, রিপোর্ট তো পেয়েছি। কিন্তু......

-- কিন্তু কি স্যার?

-- রিপোর্ট দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না!

আরিফ সাহেবের কথা শুনে চমকে উঠলাম! রিপোর্টে কি এমন আসছে যে আরিফ সাহেব নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না?

-- স্যার, আমি কি রিপোর্ট দেখতে পারি?

আরিফ সাহেব কোন কথা না বলে রিপোর্টের কাগজ আমার হাতে তুলে দিলেন। রিপোর্ট দেখে আমি ভয়ে আঁতকে উঠি। রিপোর্টে লেখা ছিল;

সাকিবের মৃত্যু হয়েছে ঘাড়ের শিরায় দুটো দাঁত বসিয়ে রক্ত চুষে নেয়ার ফলে। এরপর ঘাড় মচকে উল্টিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘাড়ে কামড় বসানোর আগে তিন ইঞ্চি নখের আঁচড়ে সাকিবের শরীর রক্তাক্ত হয়েছে।

আরিফ সাহেব দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলল;
-- উপর থেকে নির্দেশ আসছে এই কেইস ক্লোজ করে দেয়ার! তবে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে চাই এই কেইসের তদন্ত চালিয়ে যেতে। আমি চাই তোমরাও আমাকে সাহায্য কর।

-- আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব আপনাকে সাহায্য করতে!

-- গুড, প্রয়োজন হলে আমি তোমাকে কল দিব। আর হ্যা, সন্দেহজনক কিছু ঘটলে বা দেখলে আমায় ইনফর্ম করবে!

-- অবশ্যই স্যার। আমি তাহলে এখন আসি.....

থানা থেকে বের হয়ে হাসিব কে কল দিলাম। হাসিব ফোন রিসিভ করে বলল;

-- হ্যা, আলভী বল!

-- কোথায় তুই?

-- বাসায় আছি। কেন কি হয়েছে?

-- বিকেলে সব খুলে বলল। তুই এক কাজ কর! সবাইকে কল দিয়ে বিকেলে আমাদের বাসায় আসতে বল।

-- আচ্ছা ঠিক আছে।

-- তুই ও সময় মত চলে আসিস।

-- আমি আসার সময় সাগর কে সাথে নিয়ে আসব।

-- আচ্ছা ঠিক আছে। বিকেলে কথা হবে। রাখি.....

কল কেটে হাটতে লাগলাম। মনের মধ্যে এক অজানা ভয় জাগ্রত হচ্ছে! রিপোর্টের সাকিবের মৃত্যুর কারণ যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে কি সাকিবের মৃত্যু প্যারানরমাল এক্টিভিটি! ধ্যাত, কি সব ভাবছি।

ভূত-প্রেতে আমি কখনোই বিশ্বাস ছিলাম না! জ্বীন আছে সেটা জানি এবং বিশ্বাস ও করি। কিন্তু, আমার সাথে তো কখনোই প্যারানরমাল কিছু ঘটেনি। তাই বরাবর ই ভূত-প্রেত অবিশ্বাস মনে হত। এসবের ভয় ও কখনোই মনে কাজ করেনি। কিন্ত, এখন যা হচ্ছে বা ঘটছে তাতে ভয়ে চুপসে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছুই না!

সবাই এসে বাসার ড্রয়িং রুমে বসেছে। আমাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে সুপ্তি জিজ্ঞেস করল;

-- আলভী, কি হয়েছে?

আমি কোন কথাই বললাম না। কেনো জানি মুখের কথাও আটকে আসছে!
হাসিব আমাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল;
-- থানায় ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এসেছে?

আমি আস্তে করে বললাম;
-- হ্যা রিপোর্ট এসেছে।

তিথি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল;
-- মৃত্যুর কারণ জানিস?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি বললাম;
-- সকালে আরিফ সাহেব রিপোর্ট পেয়ে আমাকে থানায় ডেকেছিলেন।

শাওন আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করল;
-- রিপোর্টে কি লেখা ছিল?

সবাই আমার দিকে আগ্রহী হয়ে মৃত্যুর কারণ জানতে চাতক পাখির ন্যায় তাকিয়ে আছে। আমি সবার উদ্দেশ্যে বললাম;
-- রিপোর্টে লেখা মৃত্যুর কারণ আমি বলব! কিন্তু, তার আগে কাল মধ্য রাতে আমি যেই স্বপ্ন দেখেছি সেটা তোদের বলতে চাই!

শুভ বিরক্তি নিয়ে বলল;
-- তোর স্বপ্নের সাথে রিপোর্টের কি সম্পর্ক? এত হেয়ালিপনা না করে বললেই তো পারিস!

শুভর দিকে তাকিয়ে আমি বললাম;
-- স্বপ্নে কি দেখেছি সেটা আগে বলি! তারপর মৃত্যুর কারণ বললেই বুঝতে পারবি কি সম্পর্ক।

সবাই এক সাথে বলল;
-- আচ্ছা ঠিক আছে। স্বপ্নে কি দেখেছিস বল!

কাল মধ্য রাতে স্বপ্নে যা দেখেছিলাম তা শুরু থেকে শেষ অব্ধি বললাম। বলার সময় শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়। আমার চোখেমুখে তখন ভয়ের ছাঁপ স্পষ্টত!

পুরোটা শুনে সুপ্তি জিজ্ঞেস করল;
-- সাকিবের মৃত্যু?

কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললাম;
-- কাল রাতে স্বপ্নে আমার সাথে ঘটেছে। ঠিক সেভাবেই সাকিবের মৃত্যু হয়েছে!

কথাটি শুনে সবাই প্রচণ্ড অবাক হয়। সবার চোখ ছানাবড় হওয়ার অবস্থা প্রায়।

-- সাকিবের শরীরে যে আঁচড় পাওয়া গেছে তা তিন ইঞ্চি নখের আঁচড়! ওর মৃত্যু হয়েছে ঘাড়ের শিরায় চিকণ দুই দাঁতের কামড়ে রক্ত চুষে নেয়ার ফলে। তারপর ঘাড় মচকে উলটো করে দেয়া হয়েছে!

সবার চোখেমুখে এখন ভয়ের ছাঁপ আর অবাক হতে দেখে বললম;
-- আরিফ সাহেব ঠিক ততটাই অবাক হয়েছে যতটা আমরা হয়েছি। রিপোর্ট দেখে আমি তো নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না!

তিথি আমাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাস করল;
-- সাকিবের কেইসের কি হবে? আরিফ সাহেব কিছু বলেছে?

-- আরিফ সাহেব বলল উপর থেকে কেইস ক্লোজ করার নির্দেশ এসেছে! কিন্তু সে ব্যক্তিগত ভাবে কেইসের তদন্ত চালিয়ে যেতে চান।

সুপ্তি বিষণ্ণতা নিয়ে বলল;
-- তদন্ত করে আর কি হবে? সাকিবের মৃত্যু যে প্যারানরমাল এক্টিভিটির সাথে জড়িত!

সুপ্তির কথায় একমত পোষণ করে বললাম;
-- আমার ও তাই মনে হচ্ছে। সাকিব কে খুন করা হয়নি এতে আমি নিশ্চিত। কারণ, কোন মানুষ খুন করার জন্য রক্ত চুষে পান করবে না!
তবে আমাদের সবাইকে এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে। সাকিবের মৃত্যু যেভাবেই হোক না কেন আমাদের দিকে যে নজর পরবে না তার তো ঠিক নেই।

কথা শেষ না হতেই সুপ্তি বলল;
-- আনাফ, সন্ধ্যা হয়ে আসছে আমাদের এখন যেতে হবে! নয়তো বাসায় আবার চিন্তা করবে।

-- আচ্ছা ঠিক আছে আছে। তাহলে তোরা এখন বেরিয়ে পর! আর হ্যা, সাবধানে যাবি সবাই......

শুভ হাসি দিয়ে বলল;
-- তুই টেনশন করিস না! আমরা চলে যেতে পারব।

সবাই বাসার উদ্দেশ্যে বের হয়ে চলে গেল। কিন্তু আমার মাথায় ভৌতিক ব্যাপার'টা খুব ভালো ভাবেই চেপে বসেছে। বলা তো যায় না সাকিবের মত আমাদের মধ্যে কার সাথে কখন কি ঘটে যায়! আমি কি এসব নিয়ে একটু বেশিই ভাবছি? হয়তো সাকিবের এমন বিভৎস মৃত্যুই আমাকে ভাবাচ্ছে! আর যাই হোক, সাকিবের এমন বিভৎস মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন যে করতেই হবে!

 

                                                      ৩য় পর্বঃ 

তৃষ্ণায় মানুষের তাজা রক্ত চুষে পান করা ভ্যাম্পায়ারের গল্প অনেক পড়েছি। সাকিবের বিভৎস মৃত্যুর পর প্যারানরমাল ছাড়া মাথায় আর কিছুই আসছে না। সকাল সকাল লাইব্রেরি গিয়ে ভ্যাম্পায়ারের বই কিনে এনেছি। ভ্যাম্পায়ার সম্পর্কে জানার আগ্রহ তুঙ্গে পৌঁছেছে!

তাজা রক্ত পান করার নেশায় ভ্যাম্পায়ার মানুষের ঘাড়ে কামড় বসিয়ে রক্ত চুষে নেয়। ভ্যাম্পায়ারের কামড়ে মানুষটির মৃত্যু না হলে ও সেই মানুষটির শরীরে ভ্যাম্পায়ারের ভাইরাস প্রবেশ করে। অল্প সময়ের মধ্যে কামড়ানো মানুষটি ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয়! তখন তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তার মানুষের তাজা রক্তের প্রয়োজন হয়।

বেঁচে থাকার জন্য ভ্যাম্পায়ারের সুস্থ মানুষের তাজা রক্তের প্রয়োজন হয়। ভাইরাস জনিত কারণে ভ্যাম্পায়ারের কামড়ে সুস্থ মানুষ ও ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয়। তবে তাদের কিছু শারীরিক পরিবর্তন ছাড়া মানুষের ন্যায় সমাজে চলাফেরা করতে পারে বলে বোঝার উপায় থাকে না তারা ভ্যাম্পায়ার।

ভ্যাম্পায়ার আমাদের দেশে কিংবা এশিয়া মহাদেশে তেমন একটা দেখা না গেলেও ইউরোপ, আমেরিকা'তে ভ্যাম্পায়ার দ্রুত বিস্তার হচ্ছে। একটি ভ্যাম্পায়ারের কামড়ে একাধীক সুস্থ মানুষ ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হয় বিধায় এদের সংখ্যা বেড়ে যায়।

বই পড়ে যা বুঝলাম তাতে মনে হয় না সাকিবের ঘাড়ে ভ্যাম্পায়ার কামড় বসিয়ে রক্ত চুষে পান করেছে। যদি তাই হতো তাহলে তো সাকিব ও ভ্যাম্পায়ের পরিণত হত! তাছাড়া এটাও হতে পারে ভ্যাম্পায়ার সাকিবের ঘাড়ে কামড় বসিয়েই ছেড়ে দেয়নি! শরীরে থাকা রক্ত চুষে চুষে তৃপ্তি সহকারে পান করায় মারা গিয়েছে। যদি কামড় দেয়ার পর বেচে থাকত, তাহলে হয়তো সাকিব ও ভ্যাম্পায়ারে পরিণত হত!

এসব আমার ব্যক্তিগত ভাবনা। কিন্তু সাকিবের মৃত্যুর রহস্য এখনো মায়াজালে আবদ্ধ! কোন মানুষ যদিও বা সাকিব কে হত্যা করে থাকে তাহলে সে তো আর রক্ত চুষে পান করবে না। যদি করেও থাকে তাহলে সে তো মানুষ না! হয়তো কোন জন্তু জানোয়ার হবে নয়তো প্যারানরমাল কিছু।

ভ্যাম্পায়ারের বই পড়ে ভয় যে পাচ্ছি না তা কিন্তু নয়। রুমের লাইট অফ করতেও এখন ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে! এদানিং কি আমি বড্ড বেশিই ভীতু হয়ে পরেছি? ভীতু হবই না কেন! সাকিবের মৃত্যুর পর মানসিক ভাবে স্বাভাবিক তুলনায় অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনাই বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে। মনের মধ্যে ভয় কাজ করে, এই বুঝি আমার সাথেও সাকিবের ন্যায় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। যদি তেমনটাই ঘটে, কি বিভৎসই না হবে আমার মৃত্যু!

মৃত্যুর আগের দিন সাকিবের সাথে গল্পগুজব করেছিলাম। সাথে হাসিব ও ছিল। প্রতিদিন ই সন্ধ্যার পর মামার চায়ের দোকানের আড্ডায় বেশ গল্পগুজব করে কেটে যায়! গরম চায়ের ধোঁয়া, সিগারেটের তৃপ্তি টান আড্ডার রেশ বহুগুনে বাড়িয়ে দিত! সাকিব আকষ্মিক জিজ্ঞাস করেছিল;
-- দোস্ত, আমি যদি মরে যাই আমাকে ভুলে যাবি?

হাসিব এক গাল হেসে বলেছিল;
-- ধুর সালা! তিন দিনের দিন খিঁচুড়ী খেয়ে ভুলেই যামু সাকিব নামের কেউ বন্ধু ছিল!

আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম;
-- তুই যদি মরেই যাস, আমাদের হাসাবে কে? তখন তো আমাদের মুখের হাসিই ফিকে হয়ে যাবে!

ঠিক তাই। সাকিবের মৃত্যুর পর ঠোটের কোণে এক মুহূর্তের জন্যেও হাসি ফুটেনি। বুঝিনি সেদিন, ছেলেটি আমাদের এতোটা কাঁদিয়ে চলে যাবে। কেন এমন হলো? অকালে মৃত্যু মেনে নেওয়া কি আদৌ সম্ভব? কোন রহস্যের জালে ফেঁসে ছেলেটি জীবন হারাল?

এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর কি আদৌ খুঁজে পাব? নাকি উত্তর রহস্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকবে? এভাবে চুপচাপ তো সব কিছু মেনে নেয়া সম্ভব না!

প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় চোখ বুঝে আসছে। ডিপ্রেশন কিংবা ভয়ে ঘুমোতেও পারছি না! মনে হয় এই বুঝি ঘুমালেই আমার সাথেও এমন কিছু ঘটে যেতে পারে যা অপ্রত্যাশিত!

রাত দুইটা বেজে পঁচিশ মিনিট। মনের মধ্যে বাসা বাঁধা ভয়ের দরুনে না ঘুমিয়ে ফেবুর নিউজ ফিড স্ক্রোল করছি। ঠিক সেই মুহূর্তেই মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠল। এতো রাতে আবার কে ফোন দিল? মোবাইল হাতে নিয়ে স্কিনে তাকিয়ে দেখি শুভ কল করেছে। রিসিভ করতেই ভয়ার্ত কন্ঠে শুভ বলল;

-- আ আলভী!

-- কিরে কি হয়েছে?

-- ও ও আমাকে বাঁচতে দিবে না!

-- কে বাঁচতে দিবে না? কি আবল তাবল বকছিস!

-- ও এসেছে আলভী, আমাকে মেরে ফেলতে এসেছে!

-- শুভ, কেউ আসেনি। এতো রাতে কে আসবে? আর কেনই বা মারবে!

-- জানিনা আমি, কিচ্ছু জানিনা। আমি ওকে দেখেছি! লম্বা লম্বা চুল, অস্বাভাবিক ভাবে হাটছে বারান্দায়। আমি জানালার ফাঁক দিয়ে অবয়ব দেখেছি!

-- ধুর, কি যাতা বলছিস! সব তোর মনের ভুল। যা ঘুমিয়ে পড়!

-- ও আমাকে মারতে এসেছে। সাকিবের মত আমাকেও মেরে ফেলবে!

এ কথা বলেই শুভ ঠুকরে কেঁদে উঠল। বুঝতে পারছি না এখন ওকে কি বলব। বেশ চিন্তায় পরে গেলাম। শুভ কে জিজ্ঞাস করলাম;
-- বাসার সবাই কোথায়?

কান্না স্বরে শুভ বলল;
-- কেউ নেই বাসায়। সবাই নানু বাসায় গেছে! কাল ফিরবে বলে গেছে।

-- তুই এক কাজ কর। ভালো ভাবে দরজা, জানালা লক করে ঘুমিয়ে পর! ঘুম না আসলে কোন ভাবে রাতটা পার কর। কাল আমি তোর সাথে দেখা করব।

-- আলভী, আমার খুব ভয় করছে। আমাকে যদি মেরে ফেলে?

-- শান্ত হবি তুই? কিচ্ছু হবে না। যা বললাম তাই কর!

বুঝলাম শুভ'র ভয়টা একটু হলেও কমেছে। ও নিজেই কল কেটে দিল। একটু চিন্তাও হচ্ছে। এতো রাতে কিছু না দেখে শুভ'র ভয় পাবার কথা না। তাছাড়া সামান্য ব্যাপারে ও ঘাবড়ে যাওয়ার ছেলে নয়! নিশ্চই কিছু একটা দেখেছে। নয়তো, এতো রাতে আমাকে ফোন দিয়ে এসব বলত না। এতো রাতে শুভ'র বাসায় যাওয়াও সম্ভব না! কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না।

সকাল হওয়া অব্ধি কিছুই করা সম্ভব নয়! সকাল হলে শুভ'র বাসায় গিয়ে রাতের পুরো ঘটনা জানতে হবে। কি এমন দেখেছে? তাছাড়া এতো রাতে বারান্দায় কে হাটাহাটি করবে। নাহ, মাথা কাজ করছে না! একটার পর একটা অপ্রতিকর ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। অথচ, কি থেকে কি হচ্ছে তা আমরা বুঝেই উঠতে পারছি না!

সকালে ঘুম ভাঙল শাওনের কলে। দুই, তিনবার রিং হয়ে কেটে যাওয়ার পর পুনরায় রিং বেজে উঠল। কল রিসিভ করে বললাম;

-- বল শাওন!

ওপাশ থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ শুনে দ্রুত উঠে বসে আবার জিজ্ঞাস করলাম;
-- শাওন, কি হয়েছে?

শাওন কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল;
-- দোস্ত, শুভ..

-- শুভ কি?

-- শুভ আর বেচে নেই!

কথাটা শুনে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

-- কিহ! শুভ বেচে নেই?

-- হুম, কাল রাতে শুভ.....

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। সকালে এমন বাজে নিউজ শুনতে হবে তা কল্পনাও করিনি! কাল রাতে যেই ছেলেটির সাথে কথা বললাম সেই ছেলেটি আর বেঁচে নেই! নিজের কানকেই যেন অবিশ্বাস মনে হচ্ছে। কাছের বন্ধুদের মধ্যে শুভ ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে! ভাবতেই চোখের অশ্রু অঝোরে গড়িয়ে পরছে। এমন তো হবার কথা ছিল না! তাহলে কেন বারবার এমন হচ্ছে? কি ভুল ছিল সাকিব, শুভ'র? কার জন্যই বা ওদের জীবন দিতে হলো?

শুভ'র মৃত্যুর কথা শুনে নিজেকেই এখন অপরাধী মনে হচ্ছে। কাল কল দিয়ে ভয়ে কান্না জুড়ে দিয়ে আমায় বলেছিল " ও আমাকে বাঁচতে দিবে, আমাকে মেরে ফেলবে! "। বিশ্বাস করিনি কথা। কি লাভ হলো বিশ্বাস না করে? " মনের ভুল! " মিথ্যে বলেই বা লাভ কি হলো? বাঁচতে পারল না! 
শুভ ও কি সাকিবের মত অপমৃত্যুর স্বীকার হলো? নাকি রহস্য জনক হত্যার!  

 

                                                         ৪র্থ পর্বঃ 

শুভ'র লাশ দেখে শরীর শিউরে উঠছে! রুমের মেঝেতে উপুড় করা হাত, পা ছড়ানো লাশের ঘাড় মচকে দেয়া হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, উপুড় হয়ে শুভ ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। চোখের চাহনি দেখে মনে হচ্ছে, ভয়ার্ত চোখে অসহায়ত্বের আত্মসমর্পণ!

প্যান্ট ছাড়া শরীরে কিছুই নেই। বুক, পিঠে নখের আঁচড়ে ছিঁলে পুরো শরীর রক্তে জবজব করছে! ছোঁপ ছোঁপ রক্ত লাশের আশেপাশ, ফ্লোরে জমে আছে। শরীর থেকে রক্ত চুষে নেয়ায় শক্ত কাঠ হয়ে আছে।

আরিফ সাহেব এগিয়ে গিয়ে লাশের মাথার কাছে বসলেন। বা'হাত দিয়ে লাশের মাথা সাইডে কাত করতেই চোখে পড়ল ঘাড়ের শিরায় কামড় বসানো দাঁতের চিহ্ন! ঘাড়ের রগ টানটান হয়ে আছে এখনো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখে আরিফ সাহেব শুভ'র মেলে থাকা চোখ হাত বুলিয়ে নামিয়ে দিলেন। লাশ উল্টিয়ে মচকে উলটে দিকে থাকা মাথা সোঁজা করে দিলেন।

আমরা সবাই তাকিয়ে থেকে পাথরের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। লাশের একটু কাছে বসে কান্না করছে শুভ'র আম্মু। কিছুক্ষণ পরপর সে জ্ঞান হারাচ্ছে। দরজার সামনে মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছেন শুভ'র বাবা। এক দৃষ্টিতে তিনি ছেলের লাশের দিকে তাঁকিয়ে আছে। আর কখনো ছেলেকে দেখতে না পারার যন্ত্রণায় বুক হয়তো ফেটে যাচ্ছে!!

আরিফ সাহেব মর্গে লাশ পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। একই ভাবে পরপর দুটি মৃত্যু হওয়াতে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্টত! সাকিবের কেইস ক্লোজ করে দেয়া হলেও তার সামনে এখন শুভ'র কেইস। কিভাবে সে এই কেইস হ্যান্ডেল করবে তার চিন্তায় হয়তো তার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হচ্ছে!

শুভ'র লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় আন্টি কাঁদতে কাঁদতে অনুরোধ করে বলল; " আমার ছেলেকে আপনারা নিয়ে যাবেন না! ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারে না "। সুপ্তি, তিথী তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন।

আরিফ সাহেব এগিয়ে এসে আমার কাধেঁ হাত চাপড়ে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছে। আমাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আরিফ সাহেব বললেন;
-- আমাদের সবাইকে একদিন না একদিন চলে যেতে হবে। কেউ আগে কেউবা পরে!

আমার চোখ বেয়ে দু'ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। সাকিবের মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় শুভ'কে হারালাম! এক বন্ধুর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার শোকের কালো ছায়া আমাদের ঘিরে ধরেছে।

কাল রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমি কাউকেই বলতে পারছি না। নিজেকে বড্ড বেশিই অপরাধী মনে হচ্ছে! আমি কিভাবে বলব? কাল রাতে শুভ আমাকে কল দিয়ে বাঁচাতে বলেছে। আমি শুভ কে বাঁচাতে পারিনি!

আরিফ সাহেব, চলে যাওয়ার পূর্বে আমাকে থানায় যাওয়ার জন্য বলে গেলেন। হয়তো এই কেইসের জন্যে ও সে সাহায্য চাইবে। কিন্তু এই কেইস ও কি সাকিবের কেইসের মত ক্লোজ করে দেয়া হবে? নাকি কোন রহস্যের জাল ভেদ করা হবে!

তিথী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল;
-- এমন নৃশংস ভাবে হত্যা করার মানে কি? আমাদের'কেই কেনো টার্গেট করা হয়েছে?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে শাওন বলল;
-- এটাকে আমরা হত্যা বলব কিভাবে? মানুষ কখনোই এভাবে খুন করবে না!

শুভ'র মৃত্যুর কথা শুনার পর থেকে আমি বেশ চিন্তিত। এক এক করে আমাদের সাত জন থেকে মারা যাচ্ছে! এমন তো নয়, আমাদের সবাই কে টার্গেট করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবাই'কে হত্যা করা হবে! কিন্ত, কেন আমাদের হত্যা করা হবে? এর পিছনে লুকিয়ে থাকা রহস্য কি হতে পারে?

শুভ'র দাফনকাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেছে। রিক্সা না পাওয়া হেটে হেটে বাসায় যাচ্ছিলাম। রাস্তা'টা বেশ নির্জন হয়ে আছে। আমি একমনে হেটে যাচ্ছি। হঠাৎ করেই, কারো কণ্ঠ আমার কর্ণে পৌঁছাল। কণ্ঠ'টা আমার বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। একটু সামনে যেতেই খুব স্পষ্ট শুনতে পেলাম। আমি থমকে দাঁড়াই। হ্যাঁ, এটাতো শুভ'র কণ্ঠ! খুব ভয়ার্ত কণ্ঠে বলছে; " ও আমাকে বাঁচতে দিবে না, মেরব ফেলবে আমাকে! "। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম কেউ নেই! কিন্তু, আমি কেন শুভ'র এমন আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি। কাল রাতে এসব বলেই তো শুভ আর্তনাদ করে ছিল।

একটু পরেই কথাগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। হ্যালোসিনেশন হচ্ছে ভেবে নিলাম। নিজেকে কোন ভাবেই ক্ষমা করতে পারছি না! ছেলেটি আমায় কল দিয়ে কান্নজড়িত কণ্ঠে বলেছিল ; " আমাকে বাচঁতে দিবে না! "। আমি মিথ্যে সান্ত্বনা না দিয়ে বাঁচাতে পারলাম না!
মধ্য রাতে সান্ত্বনা দেয়া ছাড়া আমার আর কি বা করার ছিল? আমি তো কখনোই ভাবিনি ও কেও এভাবে.......

প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় লাইট অফ করে চোখ বুঝে আছি। চোখ বুঝলেই শুভ'র আর্তনাদ আমার কানে বাজেঁ। মোবাইলের রিংটোনে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি সুপ্তি কল করেছে। রিসিভ করে বললাম;
-- বল সুপ্তি!

-- রাতে খেয়েছিস?

-- কি খাব? গলা দিয়ে এখন আর কিছুই নামছে ন!

-- আলভী, আমি তোর অবস্থা বুঝি! সাকিব, শুভ আমার ও বন্ধু ছিল। কিন্তু, তাই বলে না খেয়ে থাকবি? অল্প করে হলেও খেয়ে ঘুমাবি!

সুপ্তি ঠিক বলেছে। কিন্তু, ও তো আর জানে না কাল রাতের কথা। মৃত্যুর পূর্বে আমাকে কল দিয়ে আর্তনাদ করার কথা কি সহজেই ভুলে যাওয়া সম্ভব?

নিশ্চুপ থাকায় সুপ্তি বলল;

-- কিরে, চুপ করে আছিস কেন?

-- ভাল্লাগছে না। কাল কথা হবে।

-- আচ্ছা শোন!

-- হ্যা বল....

-- কাল একটু নন্দন পার্কে আসিস। তোর সাথে কথা আছে!

-- আচ্ছা ঠিক আছে। কখন আসব?

-- নয়'টার মধ্যেই চলে আসিস।

-- আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি....

কল কেটে দিয়ে মোবাইলের স্কিনে তাকালাম। বারো'টা বেজে গেছে! সারা রাত কিভাবে কাটাব? কাল রাতের কথা, শুভ'র লাশ চোখে ভেসে উঠলে ঘুমাব কিভাবে? মনের মধ্যে ভয়টা তো সাকিবের মৃত্যুর পর-ই বাসা বেধেঁছে। চোখ বুঝলেই ওদের বিভৎস লাশ কিংবা দুঃস্বপ্ন দেখতে পাই। এভাবে সুস্থ হয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকা সম্ভব না!

সকালের প্রাতরাশ সেরে পার্কের উদ্দেশ্যে বের হলাম। এতক্ষণে হয়তো মেয়েটা এসে অপেক্ষা করছে! রিক্সা নিয়ে পার্কে চলে গেলাম। যা ভেবেছি, সুপ্তি এসে বেঞ্চে বসে আছে। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাস করলাম;

-- কখন আসলি?

-- ত্রিশ মিনিট তো হবেই! এই তোর আসা?

-- ঘুম থেকে উঠতে একটু লেট হয়ে গেছে।

-- আচ্ছা ঠিক আছে, এখন বোস!

সুপ্তির পাশে বসতে বসতে জিজ্ঞাস করলাম;
এখানে ডেকে আনলি যে, কি এমন কথা?

-- আলভী, ইদানীং আমি বড্ড বেশিই ভয় পাচ্ছি। রাতে ঠিকমত ঘুমোতে পারছি না!

আমি তো নিজেই ঘুমোতে পারিনা। ও কে কি সল্যুশন দিব!

-- ও কিছু না। আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে।

সুপ্তি বিষণ্ণতা নিয়ে বলল;
-- আর কবে ঠিক হবে? আমাদের সাথে যা হচ্ছে আমার তো মনে হচ্ছে কবে যেন আমাকেই.....

কথা শেষ করার পূর্বেই আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম;

-- চুপ! একদম চুপ। এসব কথা আর কখনোই বলবি না! কিচ্ছু হবে না তোর।

সুপ্তি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল;
-- আমি তো নিজেকে নিয়ে ভয় পাই না! আমার তো ভয় তোকে নিয়ে।

আমি একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাস করলাম;
-- আমাকে নিয়ে কেন?

সুপ্তি নিজেকে সামলে নিয়ে বলল;
-- সাকিব, শুভ'র মত যদি তোর সাথে কিছু হয়ে যায়!

-- কিছুই হবে না। তুই একদম চিন্তা করবি না!

হঠাৎ পকেটে থাকা মোবাইলের রিং বেজে উঠল।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি আরিফ সাহেব কল দিয়েছেন। রিসিভ করতেই আরিফ সাহেব বলল;

-- আলভী, একটা নিউজ আছে।

-- কি নিউজ স্যার?

-- শুভ'র শরীরে কিছু একটা পাওয়া গেছে।

-- কি সেটা?

-- তুমি এক কাজ কর। থানায় চলে আসো।

-- ঠিক আছে স্যার। আমি এক্ষুনি আসছি....

সুপ্তি কে বিদায় দিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।আরিফ সাহেবের কথায় বুঝতে পারলাম শুভ'র শরীরে এমন কিছু পাওয়া গেছে যেটা রহস্য কিছুটা হলেও ভেদ করা সম্ভবপর হবে। শুভ'কে তো সাকিবের মত করেই মেরে ফেলা হয়েছে। তাহলে ওর শরীরে কি এমন পাওয়া যেতে পারে?

 

                                                         ৫ম পর্বঃ 

আরিফ সাহেবের কপালের ভাঁজ দেখে বুঝতে পারলাম তিনি খুব চিন্তিত। গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞাস করলেন;

-- আলভী, মানুষ কখনো মানুষের রক্ত চুষে পান করতে পারে?

আরিফ সাহেবের এমন প্রশ্ন শুনে মনে হলো, এই ব্যাপারে তিনি বেশ সন্দিহান! কিন্ত এটা তো সবার জানার কথা, মানুষ কখনোই মানুষের রক্ত পান করতে পারে না! আমি জিজ্ঞেস করলাম ;

-- স্যার, মানুষ কিভাবে মানুষের রক্ত পান করবে? জন্তুজানোয়ার কিংবা রক্ত খেকো ছাড়া তা সম্ভব না!

আরিফ সাহেব বিষন্নতা নিয়ে বললেন;

-- সাকিব, শুভ'র কেইসে আমাদের সামনে যেই ক্লু আছে সেটাও ঠিক এমনি।

কথাটি শুনে আমি বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞাস করলাম;

-- কেমন ক্লু স্যার?

আরিফ সাহেব বললেন;

-- সাকিবের ময়নাতদন্তের সময় ওর শরীরের আঁচড়ে যেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গিয়েছে শুভ'র শরীর থেকে যেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে তা ম্যাচ হয়েছে। তাছাড়া শুভ'র বাহুতে নখের আঁচড়ে " T " আকৃতি লেখা পাওয়া গেছে!

-- তারমানে দু'জনের মৃত্যু হয়েছে একজনের হাতেই? আর ' T ' এর মানে কি হতে পারে?

-- হ্যা, ঠিক তাই! একই ভাবে দু'জনকে মারা হয়েছে! ' T ' কেনো আঁচড় কেটে লেখা হয়েছে সেটা এখনি বলতে পারছি না। তবে হত্যাকারী এটা লিখে কিছু নির্দেশ করতে চাইছে!

-- স্যার, আপনার কি মনে হয় এটা মানুষের কাজ?

-- আলভী, সেই ব্যাপারেই আমি সন্দিহান! বিভৎস লাশ দেখে তো মনে হচ্ছে না মানুষের করা খুন। আবার একই ভাবে দু'জনের মৃত্যু হওয়াতে মনে হচ্ছে সাইকো কিলারের করা খুন!

-- স্যার, সেটা তো আমার ও মনে হয়েছে। কিন্তু, রক্ত চুষে খাওয়ার ব্যাপারটা?

-- সেই কারণেই আমি এই কেইসে এগুতে পারছি না!!
তবে আমি চিন্তিত আছি তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে আছে তাদের কে নিয়ে।

-- কেনো স্যার?

-- আলভী, দুটো খুন-ই পর্যায়ক্রমে হয়েছে এবং তা তোমাদের মধ্যে! মৃত্যু যেভাবেই হোক আর যেই করুক, সিরিয়ালে এবার তোমাদের মধ্যেই কেউ। যদি খুব শীঘ্রই হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে না পারি তাহলে তোমাদের মধ্যে যে পাঁচজন বেঁচে আছে তার মধ্যে কারো সাথে অপ্রীতিকর কিছু ঘটতে পারে!

আরিফ সাহেবের কথা শুনে মনের মধ্যে ভয় কাজ করা শুরু হল। ভীতু কণ্ঠে বললাম;

-- স্যার, আমি আর কোন বন্ধুকেই হারাতে পারব না! কোন দূর্ঘটনা হবার আগেই আপনাকে কিছু করতে হবে।

-- আমিও সেটাই ভাবছি। যত দ্রুত সম্ভব হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে হবে। আজ থেকে আমি তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের টিম গঠন করব। আশাকরি, খুব দ্রুতই হত্যাকারীকে আমরা শনাক্ত করতে পারব!

আরিফ সাহেবের কথায় আশ্বস্ত হয়ে বললাম;

-- আমার বন্ধুদের যেন কিছু না হয় সেই দায়ীত্ব এখন আপনার!

-- অবশ্যই, আমি আমার থেকে যথাসাধ্য করার চেষ্টা করব! তুমি নিশ্চিন্ত থাকত পার। আর হ্যা, প্রয়োজনে আমি তোমাকে কল দিব। তোমাদের সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে!

-- আমরা আপনাকে সর্বাত্মক সাহায্য করব। আমি তাহলে এখন আসি.....

থানা থেকে বের হয়ে সাগর কে কল দিয়ে ওর বাসায় চলে গেলাম। সবটা শুনে সাগর ও বেশ ভীত হয়ে পরল। ভয়ার্ত চোখমুখে আমার দিকে তাঁকিয়ে জিজ্ঞাস করল;

-- দোস্ত, এরপর কার সিরিয়াল হতে পারে?

ধমক দিয়ে বললাম;

-- রাখ তোর সিরিয়াল! যে এই কাজ করতেছে সে আর কারো রক্ত পান করার সুযোগ পাবে না। সেই সুযোগ তাকে কোনভাবেই দেয়া যাবে না!

-- কিন্তু, তা কিভাবে সম্ভব?

-- আরিফ সাহেব তদন্ত টিম গঠন করেছে। এখন থেকে আমাদের ও সতর্ক থেকে হত্যাকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।

-- ঠিক বলেছিস। হত্যাকারীর পরবর্তী শিকার কে হতে পারে?

-- সেটাই তো বুঝতেছি না। তাছাড়া কবে হত্যা করার চেষ্টা করবে সেটাই তো আমাদের অজানা!

-- হুম্ম তাও ঠিক। তাহলে এখন কি করা যায়?

-- দেখি করা যায়। তুই একটু সাবধানে থাকিস!

-- আচ্ছা ঠিক আছে। তুই ও নিজের খেয়াল রাখিস!

-- আমি তাহলে এখন উঠি....

মাথার মধ্যে এখন একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কিভাবে হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে পারব? বাকী পাঁচ জন বন্ধুর জীবন কি বাঁচাতে পারব? হত্যাকারী শনাক্ত করা খুব যে সহজ হবে তা কিন্তু নয়! যেভাবেই হোক এই রহস্যের উন্মোচন করতেই হবে!

দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের অন্ধকার নিয়ে আসে দুশ্চিন্তা। ভাবছি এর পরের সিরিয়ালে কে? কার ঘাড় মচকে শিরায় কামড় বসিয়ে হত্যাকারী রক্তা চুষে নিবে। যদি নাই জানতে পারি, তাহলে তার মৃত্যুও তো সাকিব, শুভ'র ন্যায় বিভৎস হবে!

সাকিবের মৃত্যু হয়েছিল এ মাসের নয় তারিখে। তার ঠিক তিন দিন পরেই শুভ'র মৃত্যু! তিন দিন পরই কেন হলো? শুভ'র মৃত্যুও তো দু'দিন হয়ে গেল। তাহলে কি কাল রাতেই আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকা কারো শেষ দিন হবে? নাহ, কিছুতেই আর ভাবতে পারছি না!

ভোর সকালের রক্তিম সূর্য'টা বেশ সুন্দর লাগছে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস নেই! তবুও কেন জানি আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছি। হঠাৎ করেই মনে হলো সাকিবের মৃত্যুর আজ তৃতীয় দিন। ভয়ে মুখটা ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল! মোবাইল হাতে নিয়ে কন্ট্রাক্ট লিস্ট থেকে সাগরের মোবাইল নম্বার বের করে কল দিলাম। দু'তিনবার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ হতেই বললাম;

-- হ্যালো সাগর!

-- আমি সাগরের আম্মু। তুমি কে?

-- আন্টি আমি আলভী।

-- ও আলভী। সাগর তো ঘুমোচ্ছে!

-- আন্টি সাগর'কে একটু ডেকে দিন! ওর সাথে ইম্পরট্যান্ট কথা আছে....

-- আচ্ছা, তুমি একটু লাইনে থাক। আমি ডেকে দিচ্ছি....

কিছুক্ষণ লাইনে থাকার পর ওপর প্রান্ত থেকে সাগর বলল;

-- হ্যা আলভী, বল!

-- তুই ঘুমোচ্ছিস!! এদিকে চিন্তায় আমার মাথা ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে।

-- কিসের চিন্তা?

-- সব খুলে বলব। বিকেলে সবাইকে নিয়ে আমাদের বাসায় চলে আসবি! খুব ইম্পরট্যান্ট কথা আছে।

-- আচ্ছা ঠিক আছে! রাখি এখন....

সাগর কল কেটে দেয়ার পর ভাবলাম। সবাইকে আজ সতর্ক থাকতে হবে। আমি যেটা ভেবেছি সেটা যদি হয় তাহলে আজ রাতেই আমাদের মধ্যে কারো প্রাণনাশের আশংকা আছে!

বিকেল গড়াতেই সবাই আমার বাসায় চলে এসেছে। সবাই'কে দেখলাম! কিন্তু, তিথী কে দেখতে পাচ্ছি না। এত ইম্পরট্যান্ট কথা হবে অথচ তিথী নেই! পাশে বসে থাকা সুপ্তি কে জিজ্ঞাস করলাম;

-- কিরে সুপ্তি! তিথী আসল না কেনো?

-- আমি ওকে কল দিয়ে আসার কথা বলেছিলাম! ও বলল কি একটা বইয়ের জন্য নাকি বিকেলে লাইব্রেরী যেতে হবে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললাম;

-- এখানে সবার থাকা খুব জরুরী ছিল....

কথা শেষ না হতেই হাসিব বলল;

-- কি এমন কথা যে এত জরুরী ডেকে আনলি?

আমি সবাইকে উদ্দেশ্যে করে জিজ্ঞেস করলাম;
-- সাকিবের মৃত্যু হল কত তারিখে?

সুপ্তি বলল;
-- এইতো, নয় তারিখ রাতেই তো...

আমি পুনরায় জিজ্ঞাস করলাম;
-- শুভ তার কত দিন পর মারা গেল?

এবার সাগর বলে উঠল;
-- সাকিবের মৃত্যুর তিন দিন পর।

-- দুইটা মৃত্যুর ব্যবধান কত দিন?

হাসিব বলল;
-- মাত্র তিন দিন!

সবাই কে উদ্দেশ্য করে বললাম ;
-- এখন আমি যা বলব তা মনযোগ দিয়ে শোন! সাকিব নয় তারিখ রাতেই বিভৎস মৃত্যুর স্বীকার হলো। তার ঠিক তিন দিন পর একই ভাবে শুভ! দু'জনের শরীরে পাওয়া হাতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ হয়েছে। তারমানে দু'জনের হত্যাকারী একজন! আজ শুভ'র মৃত্যুর ৩ দিন হলো। কেনো জানি আমার মনে হচ্ছে আজকে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে! আমাদের মধ্যে কারো প্রাণনাশের আশংকা আছে।

কথাশুনে সবার চোখেমুখ মলিন হয়ে গেছে। ভয়ার্ত চোখে সাগর জিজ্ঞাস করল;
-- কাকে টার্গেট করা হতে পারে?

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল;
-- তা বুঝতে পারছি না! তবে আমি যেটা ভাবছি সেটা যদি হয়, বুঝতেই তো পারছিস.....তোরা সবাই আজ একটু সতর্ক থাকিস প্লিজ! যা হবার তো হয়েই গেছে। আমি আর কাউকে হারাতে চাচ্ছি না!

নীরবতা কাটিয়ে সুপ্তি বলল;
-- সবটাই বুঝেছি। আমরা সবাই সতর্ক থাকব। তুই একটু নিজের খেয়াল রাখিস!

এই মেয়েটা যে কেন এত আমায় নিয়ে ভাবে সেটাই আমি বুঝতে পারিনা। অভয় দিয়ে বললাম;
-- আচ্ছা ঠিক আছে আমি নিজেও সতর্ক থাকব! আর হ্যা, কেউ আজ এক মুহূর্তের জন্য একা হবি না। রাতে কাউকে সাথে নিয়ে ঘুমাবি!

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সবাইকে বুঝিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিলাম। তিথী যে কেন আসল না! সুপ্তি কে বলে দিয়েছি কল দিয়ে ও কে সতর্ক করে দিতে। তবুও, আসলে হয়তো ব্যাপার'টা ভালো ভাবে বুঝতে পারত!

রাত একটা বেজে গেছে! অথচ, চিন্তায় ঘুম আসছে না। সবাইকে বলেছি, অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে সাথে সাথে কল দিতে! কিন্ত, এখনো তো কেউ কল দেয়নি। কি যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না!
হঠাৎ করেই আরিফ সাহেবের কথা মনে পড়ল। শুভ'র লাশে নাকি নখের আঁচড়ে ' T ' লেখা ছিল। এটার মানে কি হতে পারে? ভাবতে লাগলাম..... নাহ, কিছুই ভেবে পাচ্ছি না!
আকষ্মিকভাবেই মনে হলো এটা তো হত্যাকারীর পরবর্তী টার্গেটের নামের প্রথম লেটার ও তো হতে পারে। তারমানে তিথী!!

দ্রুত কন্ট্রাক্ট লিস্ট থেকে তিথীর নম্বর বের করে কল দিলাম। কিন্তু, মোবাইল অফ বলছে! নাহ, আর এক মুহূর্ত দেরী না। দৌড়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম। মোবাইলের কল লিস্ট থেকে সাগরের নাম্বারে কল দিয়ে ওকে দ্রুত তিথীর বাসায় চলে আসতে বললাম!

রাস্তায় কোন রিক্সা, গাড়ি নেই! দু'একটা অটো রিক্সা যাচ্ছে তাও মানুষ ভর্তি! কিছু দূর দ্রুত পায়ে হাটার পর একটা খালি অটো রিক্সা পেয়ে উঠে বসলাম। ড্রাইভার কে তাড়া দিচ্ছি দ্রুত যাওয়ার জন্য। তিথীর কিছু হবার পূর্বেই আমাকে পৌঁছাতে হবে!

 

                                                          ৬ষ্ঠ পর্বঃ 

তিথীর বাসার বাহিরে দাঁড়িয়ে কলিংবেল চেপে যাচ্ছি। বাহির থেকে কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। কোন অঘটন ঘটল না তো! সাগর ও এখনো আসেনি। বের হওয়ার পূর্বেই তো কল দিয়ে আসতে বললাম। এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়!

কিছুক্ষণ পর বাসার দরজা খোলার আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজা খুলতেই সামনে তিথী কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম;
-- তুই ঠিক আছিস তো?

-- হ্যা, আমি তো ঠিক আছি। কিন্তু এত রাতে তুই আমাদের বাসায় কেন?

-- তোকে একটু পর সব খুলে বলছি তার আগে সুপ্তি, হাসিব কে কল দিয়ে জানতে হবে ওরা ঠিক আছে কিনা!

পকেটে থাকা মোবাইল হাতে নিয়ে সুপ্তি, হাসিব কে ফোন দিলাম। দু'জনেই ঠিক আছে। তাহলে কি আমি যেটা ভেবেছি সেটা ভুল!

কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য স্বস্তি পেলেও সাগরের কথা মনে হতেই আকষ্মিক ভাবে চোখেমুখে ভয়ের ছাঁপ ছেয়ে গেল। দ্রুত মোবাইল হাতে নিয়ে সাগর কে কল দিলাম। অপরপ্রান্তে থেকে একটি মেয়ে সুমিষ্ট কণ্ঠস্বরে বলল; " এই মুহুর্তে আপনার কাঙ্ক্ষিত নম্বরে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না! " চিন্তা বেড়ে গেল। সাগরের কিছু হলো না তো! কেন যে ও কে বের হতে বললাম। এখন মোবাইল ও অফ!

কিছুক্ষণ পর পর সাগরের মোবাইল থেকে কল আসল। কল রিসিভ করতেই জিজ্ঞাস করল;

-- হ্যালো, আপনি কি আলভী?

-- জ্বী, আমি আলভী বলছি! আপনি কে? সাগর কোথায়?

-- আলভী সাহেব, আপনি দ্রুত টি এন্টি মোড় চলে আসুন!

-- কেন, কি হয়েছে? সাগরের কিছু হয়নি তো?

-- আপনি এক্ষুনি চলে আসুন!

ভদ্র লোক এই বলে কল কেটে দিল। তিথী কে নিয়ে আমি দ্রুত টি এন্টি মোড়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। রাত তখন প্রায় দুইটা! তিথীদের বাসা থেকে টি এন্টি মোড় বেশি দূর নয়। হেটে যেতে বড়জোর ১৫ মিনিট লাগবে। দ্রুত পায়ে তিথী কে নিয়ে হাটা শুরু করলাম।

পরিত্যক্ত টি এন্টি অফিসের কাছে চার পাঁচজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। এগিয়ে সামনে যেতেই দেখি তারা কারো লাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের বামপাশে চিনচিনে ব্যথা উপলব্ধি করছি! কাছে যেতেই দেখি সাগরের লাশ!

সাগরের শরীর খামচে চিড়ে ফেলা হয়েছে। নখের আঁচড়ে শরীরে তাজা রক্ত মেখে লাল হয়ে গেছে। সবাই দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে আর বলছে; " ইশ! কি নৃশংস ভাবে মারা হয়েছে!"। সাগরের বড় বড় চোখ নিয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে, বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে!

তিথী আর্তনাদ করে কাঁদছে অথচ ও কে সান্ত্বনা দেয়ার মত অবস্থায় আমি নেই। সাগরের লাশের পাশে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছি! একই মৃত্যু বার বার দেখছি। সাগরের ফ্যামেলি কে আমি কি জবাব দিব তা বুঝতেই পারছি না! বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলের মৃত্যু কি তারা আদৌ মেনে নিতে পারবে?

খবর শুনে হাসিব, সুপ্তি তৎক্ষণাৎ সাগরের আম্মু আব্বুকে নিয়ে টি এন্টি মোড় চলে আসল। ছেলের বিভৎস লাশ দেখে সাগরের আম্মু জ্ঞান হারিয়েছি! হাসিব, সুপ্তি পাথরের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

আমার চোখে বিন্দুমাত্র জল নেই। এখন চাইলেও আমি কাঁদতে পারি না! চোখের জল হয়তো সব শুকিয়ে গেছে! শোকে পাথরে পরিণত হয়েছি। এক এক করে তিন বন্ধুর বিভৎস মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে!

আশপাশে থেকে আসা লোকজনদের মধ্যে একজন বলল;
-- এত রাতে ছেলেটা এখানে কেন যে আইলো! সুনসান এই রাস্তার পাশ দিয়া রাইতে কেউ হাইটা যাওনের কথাও মাথায় আনে না।

কথাটা আমার কর্ণে পৌঁছাতেই নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগল। এতো রাতে তো ও আমার কথায় এসেছিল! তিথীর প্রাণ বাঁচাতে এসে নিজেই প্রাণ দিল! ও যদি বাসা থেকে বের না হত তাহলে হয়তো আজ ওর সাথে এমনটা হত না! হত্যাকারীর কোন নির্দিষ্ট টার্গেট ছিল না। সুযোগ, সুবিধা মত একের পর এক নৃশংস ভাবে রক্ত চুষে হত্যা করে যাচ্ছে!

থানা থেকে ওসি আরফি সাহেব এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন! সে কোন পরিস্থিতি সামাল দিবে? ছেলে হারানো বাবা-মাকে, কিংবা তার কাছের বন্ধুদের সাত্বনা দেয়ার মত ভাষা তার আছে বলে মনে হয় না!

পূর্বের মৃত লাশ গুলোর ন্যায় আরিফ সাহেব সাগরের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে চলে গেলেন। আশপাশ থেকে আসা লোক গুলো এক এক করে সবাই চলে গেল। নির্জন অপরিত্যক্ত টি এন্টি অফিসের সেখানেই আমি বসে আছি যেখানে বিভৎস ভাবে হত্যার পর সাগরের লাশ ফেলে রাখা হয়েছিল!

সুপ্তি, তিথী কে বাসায় পৌছে দিতে হাসিব হেটে যাচ্ছে। আমি যেই বসা থেকে উঠতে যাব ঠিক সেই মুহূর্তেই সাগরের লাশ যেখানে পড়ে ছিল তার একটু দূরেই চোখ আটকে গেল। কিছু একটা পরে আছে! মোবাইলের ফ্লাস লাইটের আলোয় চকচক করছে। কাছে যেতেই দেখি লকেট সহ রক্তমাখা চেইন!

চেইন হাতে নিয়ে লকেটের দিকে তাকিয়ে বেশ অবাক হলাম । লকেটে রক্ত লেগে আছে। লকেটের মাঝে ' T ' লেটার দেখে মনে পড়ে গেল শুভ'র শরীরে লেখা ' T ' এর কথা। তারমানে আমার ভুল ভাবনার ফলে সাগরের মৃত্যু হলো! কিন্তু এই চেইন হত্যাকারী শনাক্ত করতে যথেষ্ট ভাবতেই ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি খেলে গেল। এই হাসি রক্তচোষার রহস্য উন্মোচনের!

 

                                                      ৭ম পর্বঃ

সাগরের বিভৎস লাশ চোখে ভেসে উঠছে। রক্তমাখা শরীর নখের আঁচড়ে ছিঁলে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। চোখ দুটো মৃত্যুর ভয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিল। বাঁচার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও যে ব্যর্থ হয়েছিল তা মুখ দেখেই বোঝ গিয়েছে। হত্যাকারী প্রতিবারের ন্যায় এবারও রক্তচুষে পান করতে ভুলেনি। সাগরের তাজা রক্তে হয়তো সে তার তৃষ্ণা মিটিয়েছিল! তাজা রক্তের নেশা কি তাকে এমন বিভিৎস ভাবে রক্তচুষে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করে নাকি কোন অজানা এক প্রতিশোধের নেশা তাকে রক্তচুষে পান করার তৃপ্ত করছে?

একরাশ বিষণ্ণতা নিয়ে ছাদের রেলিং এ বসে আছি। ঠোঁটে সিগারেটের প্রতিটা টানে কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করা হয়তো বোকামি, তবুও সাময়িক কষ্ট ভুলে থাকার জন্য সিগারেটের চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারে না! এক এক করে তিন বন্ধুর মৃত্যুর শোক আমাকে কষ্টের অতল সাগরে ডুবিয়ে রেখেছে। শুভ, সাগরের মৃত্যুর দায়ভার যে আমাকেই নিতে হবে! হ্যা, এটা ঠিক যে শুভ'র মৃত্যুতে আমার কিছুই করার ছিল না। আমি চাইলেও ও কে বাঁচাতে পারতাম না! কিন্তু, সাগরের মৃত্যুর দায়ভার যে আমাকেই নিতে হবে। মধ্য রাতে যদি আমি কল দিয়ে তিথীর বাসায় না আসতে বলতাম তাহলে হয়তো এমনটা হত না। আমার ভুল চিন্তাভাবনার দরুন আজ সাগরের বিভৎস মৃত্যু!

যেটা ভেবেছিলাম ঠিক সেটাই হয়েছে। শুধুমাত্র টার্গেট চিহ্নিত করতে ভুল করে ছিলাম। ভেবেছিলাম হত্যাকারী শুভ'র লাশে 'T ' লিখে পরবর্তী টার্গেট নির্দেশ করেছে। কিন্তু, এটা বুঝতে পারেনি ' T ' হত্যাকারী নিজেকেই নির্দেশ করেছে। তারমানে, হত্যাকারী মানুষ! তা কিভাবে সম্ভব? একজন মানুষের পক্ষে তো রক্ত চুষে পান করা সম্ভব না! তাহলে কি এই বিভৎস হত্যাগুলোর পিছনে অজানা কোন রহস্য লুকিয়ে আছে? কি সেই রহস্য হতে পারে?

ক্রমেক্রমে রহস্যের কুয়াশা ঝাপসা হয়ে আসছে। তিন তিনটা খুন করেও খুনি রহস্যের মায়াজালে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে! কিন্তু, এভাবে চলতে থাকলে তো তিন দিন পর তার টার্গেট আমাদের চার জনের যে কেউ হতে পারে। না তা কোন ভাবেই হতে দেয়া যাবে না! তার পূর্বেই সব রহস্য উন্মোচন করতে হবে।

হঠাৎ করে মোবাইলের রিং বেজে উঠায় ভাবনায় ছেদ পরল। মোবাইল স্কিনে তাকিয়ে দেখি সুপ্তির কল। রিসিভ করতেই বলল;

-- আলভী, কোথায় আছিস?

-- বাসার ছাদে। কেনো?

-- এত রাতে বাসার ছাদে কি করছিস?

-- কিছু না। ভালো লাগছে না তাই বসে আছি.....

-- আলভী, আমার খুব ভয় হচ্ছে। মাত্র নয় দিনের মধ্যেই সাকিব, শুভ, সাগরের মৃত্যু! এরপর আমাদের চার জনের মধ্যে যে কারোর প্রাণনাশ হতে পারে।

-- হুম্ম।

-- হুম্ম? আলভী, তিন বন্ধুর মৃত্যু হয়ে গেল তবুও কে বা কারা এমন বিভৎস হত্যা করছে তা এখনো রহস্যই রয়ে গেল। বেঁচে থাকা চারজনের মৃত্যু হতে মাত্র ১২ দিন সময়! আমি নিজেকে নিয়ে ভাবছি না। আমি শুধু তোকে নিয়েই.....

-- আমাকে নিয়ে ভাবার কিছুই নেই! আমিও যে নিজেকে নিয়ে ভাবছি তা কিন্তু নয়! আমি ভাবছি তোদের তিন জনের কথা। আমার মৃত্যু যদি সবার আগে হত তাহলে অনেক ভালো হত। আজ ওদের বিভৎস মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে থাকতে হত না!

-- চুপ! একদম এসব কথা ভাববি না। আর তুই নিজেকে এত অপরাধী ভাবছিস কেন? ওদের মৃত্যু তে তো তোর কোন হাত ছিল না! আমাদের ভাগ্যে হয়তো এমনটাই ছিল। তাই এসব হচ্ছে!

-- হয়তো তাই। তবে আমার মনে হচ্ছে হত্যাকারীর এসব হত্যার পিছনে কোন অজানা রহস্য লুকিয়েছে আছে। আর সেই রহস্যের জালে আমরা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি!

-- কি হতে পারে সেই রহস্য?

-- সেটা যদি জানতে পারতাম তাহলে তো হত। হত্যাকারী আর কাউকে রক্তচুষে হত্যা করার সুযোগ পেত না!

-- তা ঠিক বলেছিস। যেভাবেই হোক রহস্য খুঁজে বের করতে হবে।

-- আর সেটা দ্রুতই করতে হবে। প্রয়োজন রিস্ক নিতে হবে!

-- আলভী, তোর সাথে কিছু কথা ছিল।

-- হ্যা বল!

-- মোবাইলে না সামনে থেকে বলতে চাই! তুই কাল একবার দেখা করতে পারবি?

-- কখন?

-- সকাল দশটায়। যেই পার্কে প্রায় আমরা দেখা করি!

-- আচ্ছা ঠিক আছে। ঠিক সময় আমি চলে আসব। সাবধানে থাকিস! রাখি.....

কল কেটে দিয়ে গোল্ড লিফের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালাম। সিগারেটের প্রতিটা টান একটু হলেও দুশ্চিতা কমাবে। পকেটে থাকা সাগরের লাশের পাশের চেইন টা বের করলাম। চোখে সামনে উঁচু করে ধরলাম। বাতাসে লকেট দুলছে, লকেটে থাকা ' T ' কেন জানি অনেক রহস্যের জানান দিচ্ছে!

মোবাইল হাতে নিয়ে কল লিস্ট থেকে আরিফ সাহেবের নম্বার খুঁজে বের কল দিলাম। দু'বার রিং হতেই আরিফ সাহেব বলল;

-- হ্যা,আলভী বল!

-- স্যার, আপনাকে কিছু একটা দেখাতে চাচ্ছি। যেটা হত্যাকারীকে চিহ্নিত করতে পারে।

-- কি সেটা?

-- মনে হয় থানায় এসে দেখালে ভালো হবে। আপনি কি এখন ফ্রি আছেন?

-- আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে তুমি থানায় চলে আসো।

-- আচ্ছা ঠিক আছে স্যার।

রাত নয়'টা বেজে গেছে। বাসা থেকে বের হয়ে চেইন সাথে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। রিক্সায় করে বিশ মিনিটেই থানায় পৌঁছে গেলাম। ভিতরে যেতেই দেখি আরিফ সাহেব হাতে ফাইল নিয়ে খুব মনযোগী হয়ে কিছু একটা দেখছেন। আমাকে দেখেই বলল;

-- চলে এসেছ। চেয়ারটা টান দিয়ে বোস!

টেবিলের পাশে থাকা চেয়ারে বসলাম। ফাইলের দিকে চোখ রেখেই আরিফ সাহেব বললেন;

-- তা কি দেখাবে?

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললাম;

-- স্যার, কাল যখন সাগরের ডেড স্পট থেকে সবাই চলে এসেছিল, তখন আমি সেই স্পটে রক্ত মাখা কিছু একটা পেয়েছি।

কথা শুনে আরিফ সাহেব ফাইল বন্ধ করে আমার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন;

-- কি সেটা?

প্যান্টের পকেট থেকে লকেটসহ চেইনটা বের করে টেবিলে রেখে বললাম;
-- এই যে স্যার, এটা পেয়েছি।

আরিফ সাহেব চেইন হাতে নিয়ে চোখের সামনে ধরে বললেন;
-- চেইন!

-- জ্বি স্যার, লকেটসহ চেইন। এটা সাগরের লাশের একটু দূরেই পরে ছিল।

আরিফ সাহেব ভালো ভাবে নেড়েচেড়ে চেইন দেখে বলল;

-- তোমার কি মনে হয় এটা খুনির হতে পারে?

-- স্যার, আমি নিশ্চিত এটা খুনির চেইন!

-- তুমি এতটা নিশ্চিত হচ্ছ কিভাবে?

-- স্যার, আপনার খেয়াল আছে? শুভ'র লাশে ' T ' লেখা দেখেছিলেন।

-- হ্যা, মনে আছে।

-- সাগরের লাশের পাশে পাওয়া এই চেইনের লকেটেও ' T '

-- আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি এটা রেখে যাও....

-- স্যার, তাহলে আমি আসি।

-- আচ্ছা ঠিক আছে। আর হ্যা, তোমরা চারজন একটু সাবধানে থেকো। কখন কি হয় বলা তো যায় না!

-- ঠিক আছে স্যার!

থানা থেকে বের হয়ে বাসায় চলে আসলাম। ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে রুমে এলাম। মোবাইল হাতে নিয়ে ফটো গ্যালারীতে ডুকতেই শত শত স্মৃতি জড়ানো ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠল। সাত বন্ধুদের কত স্মৃতিই ছবির ফ্রেমে আবদ্ধ। সেসব ছবি এখন শুধু স্মৃতিই নয়, অধিক বেদনা দায়ক!

সকাল নয়'টা বাজতেই বাসা থেকে বের হলাম পার্কের উদ্দেশ্যে। কোন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাইলেই সুপ্তি আমায় এখানে দেখা করতে আসতে বলে। পার্কে গিয়ে দেখি সুপ্তি এখনো আসেনি। দশটা বাজার পূর্বেই আমি চলে এসেছি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর সুপ্তি এসে জিজ্ঞেস করল;

-- কিরে কখন আসলি?

-- এইতো, কিছুক্ষণ আগে।

-- আজ এতো তাড়াতাড়ি আসলি যে!

-- ভালো লাগছিল না তাই চলে আসলাম।

-- ও আচ্ছা।

-- এখন বল! কি বলবি?

-- আলভী, কথাটা আমি তোকে আরো আগেই বলতাম। কিন্তু এতদিন বলার মত পরিস্থিতি ছিল না। এখন তো না বললেই নয়!

-- আচ্ছা ঠিক আছে বল!

কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুপ্তি বলল;

-- আলভী, আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারিনা। তাই সোজাসুজি বলছি। " আমি তোকে ভালোবাসি! "

কথাটা শুনে আমি তেমন একটা অবাক হয়নি। তার কারণ, আমি আগে থেকেই জানতাম সুপ্তি আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু কখনোই তা বুঝতে দিতাম না। হয়তো বন্ধুত্ব রক্ষার্থে কিংবা মাটিতে থেকে মেঘ ছোঁয়ার ব্যর্থ চেষ্টা বলেই!
সে যাই হোক। এখন ভাবছি এটাই যে, " এ কথা বলার পরিস্থিতি এখন হলো কেন? "।

নিস্তব্ধতা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলাম;
-- এ কথা বলার মত পরিস্থিতি এখন হল কেন?

-- তুই তো দেখছিস! আমাদের সাথে কি হচ্ছে। এখন শুধু আমরা চারজন ই বেঁচে আছি। তোর কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচতে পারব না!

কথাটি বলেই সুপ্তি কাঁদতে লাগল। কাঁন্না দেখে আমি বিষ্মিত হয়ে বললাম;

-- আরে, কাঁদতেছিস কেন? আমার তো কিছুই হয়নি।

নিজেকে সামলে সুপ্তি বলল;

-- কিছু হয়নি। হতে কতক্ষণ?

-- আচ্ছা ঠিক আছে। এখন বল তুই কি চাচ্ছিস?

সুপ্তি খুব কাছে এসে আমার ডান হাত ওর দু'হাতে মুষ্টিবদ্ধ কর বলল;

-- আলভী, চল না দূরে কোথাও গিয়ে আমরা নতুন করে বাঁচি। যেখানে তোকে হারানোর কোন ভয় থাকবে না, থাকবেনা কোন রহস্যে ঘেরা মৃত্যুকূপ!

-- সুপ্তি, আমি এতটা স্বার্থপর নই যে হাসিব, তিথীর জীবন মৃত্যুকূপে ফেলে দূরে কোথাও চলে যেতে! শুধু নিজেদের নিয়ে ভাবলে হবে? ওদের কথাও তো ভাবতে হবে।

সুপ্তি চুপ হয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পরতে দেখেও আমি নিরুপায়! যতদিন না পর্যন্ত এই বিভৎস মৃত্যুর অবসান ঘটছে ততদিন আমাকে এখানে থেকে রহস্যের উন্মোচন করে হত্যাকারীর মুখোশ খুলতে হবে!

হঠাৎ করেই মোবাইলের রিং বেজে উঠল। মোবাইল হাতে নিয়ে স্কিনে তাকাতেই দেখি আরিফ সাহেব কল দিয়েছেন। রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে আরিফ সাহেব বলল;

-- আলভী, তুমি যেখানেই থাকো দ্রুত থানায় চলে আসো। হত্যাকারী'কে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি!

 

                                                               ৮ম পর্বঃ

সুপ্তি কে নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। যাবার পথে হাসিব কে কল দিয়ে থানায় আসতে বললাম। হত্যাকারী'কে শনাক্ত করতে পেরেছে শুনে সুপ্তির মুখে হাসি ফুটেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না! আমিও বেশ স্বস্তিবোধ করছি। হত্যাকারী কে তা জানার এবং দেখার জন্য দু'জনে উদগ্রীব হয়ে থানায় পৌঁছালাম।

আরিফ সাহেবের রুমে প্রবেশ করতেই যেটা দেখলাম তা দেখার জন্য সুপ্তি কিংবা আমি কেউ প্রস্তুত ছিলাম না! তিথী কে হ্যান্ডক্যাপ পরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তিথীর মুখনিঃসৃত হচ্ছে; " স্যার, বিশ্বাস করুণ!, আমি হত্যা করিনি"। তিথীর চোখ বেয়ে অশ্রু নিঃসৃত হচ্ছে। এহেন অবস্থায় আমাদের দু'জনের চোখ ছানাবড় প্রায়। নিমিশেই সব কিছু কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তাহলে কি তিথীই রক্তচোষা হত্যাকারী?

আমাদের দেখতে পেয়ে তিথীর মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটল। হয়তো এই ভেবে যে, আমরা থানা থেকে ও কে ছাড়িয়ে নিতে এসেছি! কিন্তু, তিথী যে হত্যাকারী এটা বিশ্বাস করব নাকি নিজেকে অবিশ্বাস করব তাতেই যত সংশয়!

তিথী করুণ স্বরে বলল;
-- তোরা দু'জন আমাকে বিশ্বাস কর! আমি এসব করিনি। আমি খুন করিনি!

আমাদের নীরবতা তিথী কে হতাশ করল। কাঁদতে কাঁদতে বলল;

-- তোরা তো আমাকে চিনিস, জানিস। তোরা একটু ওসি কে বল, আমি এসব করিনি!

তিথীর দিকে তাকিয়ে তখন মনে হল, পৃথিবীর সব চাইতে নিরুপায় মেয়েটিই হয়তো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

নিশ্চুপ হয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। সুপ্তি থানায় এসে এমন কিছু দেখবে তা হয়তো কল্পনাও করেনি। তবুও চোখের সামনে খুব কাছের বন্ধু'কে নিরুপায় হয়ে কাঁদতে দেখে আমাদের দু'জনের অন্তরে দাগ কেটেছে তা বলার অবকাশ নেই!

সব কিছু দেখেও আমাদের এখন আর কিছুই বলার নেই! প্রকৃত সত্যটা সবার সামনে আসার আগে আইনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যে আমাদের যেতে হবে। তিথীর উপর তাদের সন্দেহ যে অনেক দূর পৌঁছে গেছে! হয়তো, সত্যিটা জানার জন্য তারা তিথীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। যদি তাতেও সত্যিটা বের না হয় তাহলে হয়তো রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হতে পারে!

হাসিব প্রতিমধ্যে চলে আসল। ভিতরে প্রবেশ করে যেন তিথীকেই ওর চোঁখ জোড়া খুঁজে পেল। চোখ মুখ মলিনের ছাঁপ স্পষ্ট ফুঁটে উঠেছে। কাপা কাপা কণ্ঠে হাসিব জিজ্ঞেস করল;

-- তিথী তুই! তুই ওদের হত্যা করেছিস?

কান্না জড়িত কণ্ঠে তিথী বলল;

-- তোরা বিশ্বাস কর, আমি ওদের খুন করিনি!

কেউ কিছু বলছে না। রুমে শুধু তিথীর কান্নার আওয়াজ ভারী হচ্ছে! আমি ' থ ' হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আরিফ সাহেব বললেন;

-- রক্তচোষা হত্যাকারী কে তা তো দেখলে! সব কয়টা হত্যা ও একাই করেছে। স্বীকার করছে না! রিমান্ডে দিলে সব কথা আপনা আপনি স্বীকার করবে।

কথা গুলো শুনতে পেয়ে তিথীর আর্তনাদ বেড়ে গেল। কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল;

-- স্যার, সত্যি বলছি আমি খুন করিনি! আমি সম্পূর্ন সুস্থ।

আরিফ সাহেব যেন তিথীর কোন কথা কানেই নিচ্ছে না! কনস্টেবল কে ডেকে তিথীকে থানার জেলে আটকে রাখতে বললন। তিথী কে নিয়ে যাবার পর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন;

-- আলভী, তিথী অসুস্থ বিকৃত মস্তিষ্কের রক্তচোষা হত্যাকারী।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম;

-- তিথীর বিরুদ্ধে কোন প্রুভ পেয়েছেন?

ভ্রু কুঁচকে আরিফ সাহেব বললেন;

-- তেমন কোন প্রুভ পাইনি। তবে প্রথম থেকেই তিথী সন্দেহভাজনদের তালিকার শুরুতে ছিল! আমার তদন্তকারী টিম তার উপর নজরদারী রাখার ফলে এমন কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছে যার কারণে তাকে গ্রেফতার করা!

নীরবতা কাটিয়ে সুপ্তি বলল;

-- কি সেই তথ্য?

আরিফ সাহেব বললেন;

-- খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তিথী বাসায় তেমন একটা থাকে না। রাতে বাসায় ফেরেও রাত করে! আশপাশের মানুষের চোখে তেমন একটা ধরা দিত না। সব সময় গা ঢাকা দিয়ে থাকার চেষ্টা করত। তাছাড়া শুভ'র যে রাতে মৃত্যু হলো সে রাতে তিথী বাসায় ফিরেনি!

হাসিব জিজ্ঞেস করল;

-- তাহলে কি তিথীই রক্তচুষে পান করত?

আরিফ সাহেব একটু সন্দিহান হয়ে বলল;

-- হয়তো বা।

আরিফ সাহেব কে সন্দিহান থাকতে দেখে বললাম;

-- তাহলে তো আপনি পুরোপুরি শিউর না তিথীই হত্যাকারী।

-- শিউর হতে না পারলেও জিজ্ঞাসাবাদ তো করা যেতেই পারে!

-- আচ্ছা ঠিক আছে। আপনার যেটা ভালো মনে হয় আপনি সেটাই করুণ!

আমার কথা শেষ হতেই আরিফ সাহেব বলল;

-- তোমরা এখন নিশ্চিন্তে বাসায় যেতে পার। আমার মনে হয় আমরা প্রকৃত খুনিকেই ধরতে পেরেছি! এখন যদি জিজ্ঞাসাবাদ করেও কিছু না জানা যায় তাহলে রিমান্ডের জন্য আবেদন করা হবে!

সুপ্তি বলল;

-- সত্যিটা জানার পর অবশ্যই আমাদের জানাবেন!

-- অবশ্যই! তোমরা এখন আসতে পার....

থানা থেকে বের হয়ে আসলাম। সুপ্তি, হাসিব নিশ্চুপ হয়ে আছে। চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে এই মাত্র বড় একটা ঝড় বয়ে গেল! হাসিব আমাকে বলল;

-- আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তিথী হত্যা করেনি। এসব কাজ ও করতেই পারে না!

সুপ্তি হাসিবের দিকে তাকিয়ে বলল;

-- আমার ও তো বিশ্বাস হচ্ছে না! এতদিন যাবত ও আমাদের সাথে আর আমরা বুঝতে পারলাম না। এটা ঠিক যে, তিথী সবসময় চুপচাপ থাকে। তাই বলে এত বিভৎস ভাবে হত্যা!

ওদের কথা শুনে বললাম;

-- যাইহোক বাদ দে এসব। জিজ্ঞাসাবাদে সব সত্য মিথ্যা বেড়িয়ে আসবে। অনেক বাজে, চল বাসায় যাই!

সুপ্তি আমার দিকে তাকিয়ে বলল;

-- আমায় একটু বাসায় পৌঁছে দিবি?

সুপ্তির কথায় সায় দিয়ে হাসিব বলল;

-- আলভী তুই সুপ্তি কে পৌঁছে দিয়ে আয়। আমি চলে যাচ্ছি।

এই বলে হাসিব বাসার দিকে রওয়ানা দিল। রিক্সা ডেকে সুপ্তি কে নিয়ে উঠে বসলাম। পুরোটা পথ দু'জনেই নিঃশব্দে বসে রইলাম। সুপ্তি কে বাসায় পৌঁছে দিয়ে বাসায় চলে এলাম।

মাথায় চিন্তাভাবনা একদম-ই কমেনি। বরং আগের থেকে এখন একটু বেশিই হচ্ছে! কেন জানি মনে হচ্ছে প্রকৃত হত্যাকারীর নিকট আমরা এখনো পৌঁছাতে পারিনি। রহস্যের মায়াজালে এখনো আমরা বেঁচে থাকা চার জন আবদ্ধ হয়ে আছি!

একটা ব্যাপার তো কিছুতেই মিলাতে পারছি না। ধরে নিলাম আরিফ সাহেবের সন্দেহের তীর লক্ষভেদ করে প্রকৃত হত্যাকারী তিথী কে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু, এমন নৃশংস, বিভৎস ভাবে তিথীর হত্যা করার পিছনের রহস্য কি? কিসের প্রতিশোধের নেশায় তিথী পর পর রক্ত চুষে পান করে হত্যা করল?

জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্ন গুলো আরিফ সাহেব তিথীকে করবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই! কিন্তু, আদৌ কি আরিফ সাহেব এসব প্রশ্নের উত্তর পাবেন?

তিথীই যদি প্রকৃত হত্যাকারী হয়ে থাকে তাহলে আমরা বিভৎস ভাবে হত্যাকারীর রক্ত চুষে নৃশংস হত্যার হাত থেকে মুক্তি পাব। কিন্তু, তার ব্যতিক্রম হলে আগামীকাল রাত হয়তো আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকা চার জনের কারো জীবনের শেষ রাত হবে!



                                                           ৯ম পর্বঃ

আজ রাতের কি ঘটতে যাচ্ছে সেই চিন্তা মাথায় চেপে বসেছে। তিথী যে হত্যাকারী নয় সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হওয়াতেই যত দুশ্চিন্তা। তিথী হয়তো থানায় থাকায় প্রাণনাশের আশংকা নেই! কিন্তু, আমাদের তিন জনের বেঁচে থাকা আজ রাতে প্রকৃত হত্যাকারীর নিকট অনেকটা নির্ভরশীল।

আরিফ সাহেব চেইনের সূত্র ধরে যে তিথী কে আটক করেনি সেটা আগেই বুঝতে পেরেছি। সে হয়তো চেইনের সূত্র না ধরে তিথীর এক্টিভিটির উপর নজরদারীর ভিত্তিতে সন্দেহাতীত তিথীকে আটক করেছেন । তিথী যদি প্রকৃত হত্যাকারী হয়ে থাকে তাহলে তো রক্তুচুষে পান করা কাজটা ওর মাধ্যমেই হয়ে থাকত। একজন সুস্থ মস্তিকের মানুষের দ্বারা এমন ভাবে হত্যা করা কখনোই সম্ভব না।

আরিফ সাহেব হয়তো ভেবেছেন তিথী প্রত্যক্ষ ভাবে নিজে হত্যা করছে না। প্রকৃত হত্যাকারী'কে দিয়ে এসব হত্যা করাচ্ছেন! কিংবা হত্যাকারী কে সাহায্য করছেন। আরিফ সাহেবের এসব ভাবনার আদৌ কি সত্য?

প্রকৃত হত্যাকারী যে হোক না কেনো। সে কখনোই সুস্থ মস্তিষ্কের নয়। রক্তচুষে হত্যা করার পিছনে হয়তো অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। যেই রহসের ভেদ করতে আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। প্রতিশোধের নেশায়, হত্যাকারী একের পর এক নৃশংস ভাবে রক্ত চুষে পান করে পৈচাশিক আনন্দে মেতে উঠছে! হয়তো আজ রাত ও তার ব্যতিক্রম নয়!

সাগরের মৃত্যুর আজ তৃতীয়তম রাত কিংবা বিভৎস রাত। হয়তো আমাদের তিন জনের মধ্যে কারো জীবনের শেষ রাত আজ হতে যাচ্ছে! তাহলে কি আমার জীবনের আজ শেষ রাত হতে যাচ্ছে? হতেই পারে! কারণ, হত্যাকারী কোন নির্দিষ্ট টার্গেটে হত্যা করছে না। তাহলে কি আমার মত সুপ্তি, হাসিবের ও নিজের জীবন সংকটাপন্ন মনে হচ্ছে?

মোবাইলে রিং বাজছে। ঘুমে চোখ সবে লেগে আসছিল। মোবাইলের স্কিনে তাকাতেই দেখি সুপ্তি কল করেছে। হঠাৎ করেই মনে হল, সুপ্তির কিছু হয়নি তো? কল রিসিভ করে জিজ্ঞেস করলাম;

-- সুপ্তি, তুই ঠিক আছিস?

-- হ্যা, আমি ঠিক আছি। তোর কাছে একটা ব্যাপারে জানার দরকার ছিল।

-- কোন ব্যাপারে?

-- সাগরের লাশের পাশে পাওয়া চেইনের ব্যাপারে।

-- ও আচ্ছা। তো কি জানতে চাস?

-- আলভী, চেইনটা কেমন ছিল?

-- লকেট সহ রুপার তৈরি মোটা চেইন।

-- কেমন লকেট?

-- লকেটে ' T ' লেটার ছিল।

সুপ্তি কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চুপ হয়ে রইল। নীরবতা কাটিয়ে সুপ্তি বলল;

-- আলভী, ঐ চেইনটা আমাকে এখন দেখাতে পারবি? আমার দেখা খুব দরকার!

সুপ্তির কণ্ঠ শুনে মনে হলো খুব অস্থিরতা বোধ করছে। আমি বললাম;

-- চেইনটা তো আরিফ সাহেবের কাছে। আর এত রাতে তোকে আমি কিভাবে দেখাব?

-- আরিফ সাহেব এখন কোথায় থাকতে পারে? থানায় নাকি বাসায়?

-- এখন তো বারোটার বেশি বাজে। থানা থেকে মনে হয় বাসায় চলে আসছে।

সুপ্তির ভয়ার্ত কণ্ঠ এখন নিশ্চুপ হয়ে আছে। চেইন দেখার অস্থিরতা যে ওর মধ্যে ব্যাপক কাজ করছে সেটা বুঝতে জিজ্ঞেস করলাম;

-- আচ্ছা, চেইন দেখে তুই কি করবি?

-- আলভী, চেইনের মধ্যেই অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে। যদি সেই চেইনটা হয়.....

-- কোন চেইন?

-- তোকে সব খুলে বলতে হবে। এখন বললে কিছুই বুঝবি না। তুই এক কাজ কর! দ্রুত আমার বাসায় চলে আয়।

-- এতো রাতে তোর বাসায় কেনো?

-- এখান থেকে তুই আমাকে নিয়ে আরিফ সাহেবের বাসায় যাবি। চেইনটা যে আমাকে দেখতেই হবে!

-- আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আসছি.....

সামান্য এই চেইনটার মধ্যে কি সেই রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে সেটাই আমার মাথায় কাজ করছে না! সুপ্তিই বা চেইনের ব্যাপারে এমন কি জানে? যার জন্য ওর মধ্যে এত অস্থিরতা কাজ করছে?

সব প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য বাসা থেকে সুপ্তিদের বাসার উদ্দেশ্যে বের হলাম। এত রাতে গাড়ি পাওয়াও দুষ্কর! পাশের বাসার আঙ্কেল কে ম্যানেজ করে তার বাইক চেয়ে নিলাম। দেরী না করে সোজা চলে গেলাম সুপ্তিদের বাসার নিচে।

সুপ্তি বাসার নিচে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সাথে বাইক দেখে এক স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলল;

-- বাইক নিয়ে এসে ভালোই করেছিস। এতো রাতে গাড়ি পাওয়া ঝামেলা হয়ে যেত।

-- তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোকে এত অস্থির লাগছে কেন?

-- সব বলব। আগে আরিফ সাহেবের বাসায় চল!

-- আচ্ছা ঠিক আছে।

আরিফ সাহেবের বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ কলিংবেল চাপলাম। মিনিট পাঁচেক পর এক ভদ্র মহিলা দরজা খুঁলে জিজ্ঞেস করল;

-- এত রাতে কাকে চাই?

সুপ্তি বলল;

-- আরিফ সাহেব বাসায় আছেন?

ভদ্র মহিলা বললেন;

-- হ্যা, আছেন। কিন্তু এত রাতে তাকে কেন দরকার? কোন সমস্যা?

ভদ্র মহিলা প্রশ্ন করতেই বললাম;

-- জ্বী, তার সাথে একটু দেখা করার দরকার।

ভদ্র মহিলা ভিতরে আসতে বলে আরিফ সাহেব কে ডাকতে গেলেন। ড্রয়িং রুমে সুপ্তি কে নিয়ে বসে পরলাম। সুপ্তির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম চেইনটা দেখার জন্য ও অধির আগ্রহ নিয়ে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর আরিফ সাহেব এসে আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন;

-- কি ব্যাপার আলভী। তোমরা এত রাতে! কোন সমস্যা হয়নি তো?

আরিফ সাহেব্র প্রশ্ন শুনে বললাম;

-- স্যার, আপনাকে যেই চেইন টা দিয়েছিলাম সেটা সুপ্তি এখন দেখতে চাচ্ছে!

সুপ্তির দিকে তাকিয়ে আরিফ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন;

-- এত রাতে চেইন দেখার কি আছে? কাল-ই তো দেখতে পারতে!

সুপ্তি উৎকণ্ঠ নিয়ে বলল;

-- স্যার, আমাকে এক্ষুনি চেইনটা দেখতে হবে। আপনি যদি চেইনটা দেখাতেন.....

আরিফ সাহেব সুপ্তির চোখমুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন;

-- আচ্ছা ঠিক আছে। তোমরা বসো! আমি চেইন নিয়ে আসছি....

আরিফ সাহেব চেইন আনার জন্য চলে যেতেই সুপ্তি বলল;

-- আলভী, আমার মনে হয় আজ কোন অঘটন ঘটতে যাচ্ছে! যা করার আমাদের দ্রুত করতে হবে।

সুপ্তির কথা শুনে মনে হলো, ও ঠিকই বলছে। তিথী যদি হত্যাকারী না হয় তাহলে আজ পূর্বের ন্যায় বিভৎস কিছু যে হতেই পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না!
কিছুক্ষণ পর আরিফ সাহেব রুমে এসে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন। হাতে রাখা চেইন সুপ্তির দিকে বাড়িয়ে বললেন;

-- এই সেই চেইন। যেটা আলভী, সাগরের লাশের পাশে পেয়েছে!

চেইন হাতে নিয়ে সুপ্তির চোখ যেন চেইনে আটকে গেল। এক দৃষ্টিতে চেইনের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে, চেইন দেখে সুপ্তি ঘাবড়ে গেছে। ভালোভাবে দেখার পর ভয়ার্ত কণ্ঠে সুপ্তি বলল;

-- না না, এটা কি করে সম্ভব! এটা হতে পারে না!

সুপ্তি কে হঠাৎ ঘাবড়ে যেতে দেখে এবং কথা শুনে আরিফ সাহেব এবং আমি বেশ অবাক হলাম। আরিফ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন;

-- কি হতে পারে না? আর তুমি এত ঘাবড়ে যাচ্ছে কেন?

সুপ্তির চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে চেইনটা ও আগে কোথায় দেখেছে। কিংবা চেইনের রহস্য সুপ্তির জানা আছে! কিন্তু, সুপ্তি চেইন হাতে নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, চেইনটা ও'কে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। সুপ্তির এহেন অবস্থা দেখে আরিফ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন;

-- তুমি কি এই চেইনের ব্যাপারে কিছু জানো? আগে কোথাও দেখেছ?

সুপ্তি ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন;

-- আমাদের এক্ষুণি হাসিবের বাসায় যেতে হবে। ওর জীবন সংকটাপন্ন!

আরিফ সাহেব সুপ্তির কথা শুনে অবাক হয়ে বললেন;

-- তুমি কিভাবে জানো? তাছাড়া, তিথী কে তো থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাখা হয়েছে। তাহলে হাসিবের জীবন সংকটাপন্ন হবে কি করে?

হাসিব সাহেবের কথা শুনে সুপ্তি দৃঢ় কণ্ঠে বলল;

-- তিথী প্রকৃত হত্যাকারী নয়। হত্যাকারী অন্য কেউ। আমাদের এক্ষুনি হাসিবের বাসায় যাওয়া উচিত। হাতে যে সময় একদম কম!

আমি হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকালাম। একটা বেজে দশ মিনিট। প্রায় মধ্য রাত হয়ে এসেছে। হত্যাকারী প্রতিটা খুন মধ্য রাতেই করেছে। তাহলে কি হাসিবের জীবন হুমকির মুখে?

আরিফ সাহেব সুপ্তির কথা শুনে বুঝতে পারলেন। প্রকৃত খুনি তিথী নয়। বরং এমন কেউ হত্যাকারী যার রহস্য শুধুমাত্র সুপ্তিই জানে। তাই পাঁচ সাত না ভেবে আমাকে বললেন;

-- আলভী, তাহলে আমাদের মনে হয় হাসিবদের বাসায় যাওয়া উচিত! দেরী করা যাবে না। আমাদের এক্ষুনি যেতে হবে!

আরিফ সাহেব কে নিয়ে আমরা হাসিবের বাসার উদ্দেশ্যে বের হলাম। যাওয়ার পূর্বের হাসিবের নম্বরে সুপ্তি কল দিল। রিং হচ্ছে কিন্তু হাসিব কল ধরছে না দেখে আমাদের সন্দেহ, ভাবনা প্রকট হল।

হাসিবদের বাসায় যেতে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ মিনিট সময় লাগবে। বার বার বলে দিয়েছি যাতে সাবধানে থাকে। একের পর এক বিভৎস মৃত্যু হচ্ছে অথচ আমরা নির্বাক হয়ে শুধুই দেখছি! তবে কি আর একটি বিভৎস মৃত্যুর সাক্ষী আমরা হতে যাচ্ছি?

 

                                                          ১০ম পর্বঃ

তিথীর ক্ষতবিক্ষত লাশ নিস্তেজ হয়ে পরে আছে। ফ্লোরে রক্তের ফোয়ারা বইছে। পূর্বের ন্যায় ঘাড় থেকে দাঁত বসিয়ে রক্ত চুষে নিয়েছে হত্যাকারী। কিন্তু, তাতেই সে থেমে থাকেনি। তিথীর শরীরের বিভিন্ন অংশ চিঁড়ে ফেলেছে। থানার মধ্যে তিথীর নৃশংস মৃত্যুতে মিডিয়া, প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। লাশ দেখে বুঝা যাচ্ছে হত্যাকারী পূর্বের থেকে আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে বিভৎস ভাবে হত্যা করেছে।

তিথীর এহেন বিভৎস মৃত্যুতে শহর জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পরল। মিডিয়াতে ফলাও ভাবে নৃশংস হত্যার রিপোর্ট আসতেই সবার গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। জনমুখে একটাই প্রশ্ন; " রক্তচোষা হত্যাকারী কে হতে পারে? "।

গতরাতে হাসিবদের বাসায় যাওয়ার পর হাসিব কে সশরীরে দেখতে পেয়ে আমরা স্বস্তি পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, হত্যাকারী গা-ঢাকা দিয়েছে। কিন্তু, কোনে ভাবে মাথাতেই আসেনি তিথীকে থানার মধ্যেই নৃশংস ভাবে হত্যা করা হতে পারে।

রাতে থানায় দু'জন কনস্টেবল ছাড়া কেউ-ই ছিল না। সেই সুযোগে হত্যাকারী থানায় প্রবেশ করে তিথী কে বিভৎস ভাবে হত্যা করে। আমাদের মস্তিষ্কের ভাবনার বাহিরে হত্যাকারীর জগত। তাই হয়তো আমাদের ভাবনায় সে পা দেয়নি কখনো।

ভেবেছিলাম থানায় থাকাতে তিথীর প্রাণনাশের হুমকি নেই। কিন্তু, আমাদের সেই ভাবনা ভুল প্রমাণিত করে হত্যাকারী তার শিকার ঠিকই খুঁজে রক্তচুষে নিয়েছে।

রহস্যের আবদ্ধে থাকা কে সেই হত্যাকারী? কেনই বা সে একের পর এক হত্যা করে যাচ্ছে? এই রহস্য কি সুপ্তির জানা আছে? নাকি, রহস্য আরো ঘন কুয়াশার চাদরে জড়িয়ে রবে?

উপর থেকে আরিফ সাহেবের উপর এই মৃত্যুর জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। যেভাবেই হোক হত্যাকারী কে অতি দ্রুত গ্রেফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আরিফ সাহেব আমাদের তিন জন কে থানায় ডেকে পাঠালেন। থানায় গিয়ে দেখি আরিফ সাহেবের কপালে চিন্তার ভাঁজ। আরিফ সাহেব নিজেও বুঝতে পারছে না একজন হত্যাকারী কিভাবে আইনের ধরাছোঁয়ার বাহিরে থেকে এমন বিভৎস ভাবে হত্যা করছে।
আরিফ সাহেব চেইনের প্রসঙ্গ টেনে বললেন;

-- সুপ্তি, চেইনের ব্যাপারে তুমি যা জানো সবটা বল!

মানসিক ভাবে ভেঙে পরাতে সুপ্তি নিশ্চুপ হয়ে আছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সুপ্তি বলল;

-- এই চেইনটা আমি অনেক আগে দেখেছি। এমনকি চেইনের মানুষটিকেও খুব ভালো ভাবে চিনি!

সুপ্তির কথা শুনে আরিফ সাহেব এবং আমি বেশ অবাক হলাম। আরিফ সাহেব উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন;

-- তার মানে তুমি খুনিকে চিনো?

সুপ্তি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল;

-- হ্যা চিনি। খুব ভালো করেই চিনি। পরিচিত মুখটা এত সহজেই ভুলে যাব কিভাবে?

সুপ্তির মুখে এসব শুনে প্রচণ্ড অবাক হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম;

-- তুই কি বলছিস! এই চেইন কার?

আরিফ সাহেব সবটা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে সুপ্তি কে বললেন;
-- তুমি যা জানো সবটা খুলে বল!

সুপ্তি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল;

চার বছর পূর্বের কথা। তখন আমরা গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর থাকি। বাবা তখন ঢাকাতে থাকতেন। আমার বাবা, ইমতিয়াজ রকিব ছিলেন দেশের নামকরা সাইন্টিস্ট। পরিবারে আমি, ছোট ভাই আর আম্মু গ্রামেই থাকতাম।

আমি সবে মাত্র এসএসসি পাশ করে শরীয়তপুর সরকারী কলেজে ভর্তি হয়েছি। ভালোই যাচ্ছিল সে সময়ের দিনগুলো। কলেজ লাইফের শুরুটা ছিল অনেক আনন্দের। কিন্তু, সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি!

একসময় আমি বুঝতে পারি কলেজে কেউ একজন আমায় প্রতিনিয়ত ফলো করছে। একদিন কলেজে শেষে বাসায় ফিরছিলাম। ঠিক সে সময়ে আমার পিছনে ফলো করতে থাকা কারো উপস্থিতি টের পেয়ে আমি পিছু তাকাতেই একটি ছেলেকে দেখতে পাই। শ্যামলা বর্নের ছেলেটি দেখতে বোকাসোকা টাইপের ছিল। নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম;

-- আপনি প্রতিনিয়ত আমাকে ফলো করছেন কেনো?

ছেলেটি মাথা নিচু করেই বলল;
-- কই না না'তো! আমি তো তোমাকে ফলো করব কেনো?

-- কেন ফলো করবেন সেটা আপনিই ভালো জেনে থাকবেন। তবে আপনার মুখ থেকে ফলো না করার কথা শুনে খুশি হলাম। আশাকরি, পরবর্তীতে ও এমন কাজ করবেন না!

সেদিন ছেলেটি কে দু'চারটে কথা শুনিয়ে ছেড়ে দিলাম। কলেজ এসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ছেলেটির নাম তৌকির। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। আমাকে নাকি সে বেশ কিছুদিন যাবত ফলো করছে।

এক সপ্তাহ তৌকির কে আমার পিছু নিতে দেখিনি। ভেবেছিলাম, আমার কথা শুনে আর ফলো করবে না। কিন্তু, তার পর থেকে কলেজে আমাকে সারাক্ষণ ফলো করত। আমি যেখানেই যেতাম সেখানেই ও কে দেখতে পেতাম। একসময় আমি খুবই বিরক্ত হয়ে যাই।

বারবার বারণ করা সত্ত্বেও তৌকির আমার পিছু নিত। দু'মাস পর থেকে আরো বেশিই বিরক্ত করতে শুরু করে আমায়। তৌকির কে আমি মোটেও সহ্য করতে পারতাম না।

তৌকির ছিল মধ্য বিত্ত পরিবারের। আমার স্টাটাসের ধারে কাছেও সে ছিল না। তাকে এটা বারবার বুঝাতে গিয়েও আমি ব্যর্থ হয়ে কোন উপায়ান্তর না দেখে ছোট চাচ্চু কে সবটা খুলে বলি। ছোট চাচ্চু তৌকির কে ডেকে বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা! আমাকে ফলো করা তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হল।

কলেজ থেকে যখন ভর দুপুরে বাসায় ফিরতাম, তখন রাস্তায় কাউকে চোখে না পরলেও তৌকির কে ঠিকই পেতাম। প্রায় সময় আমাকে রাস্তার মাঝে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করত "কেমন আছি!"।

বোকাসোকা ছেলেটি একসময় আমার জন্য খুব পাগলাটে হয়ে যায়। কারো কথাই যেন তার কর্ণে পৌঁছাত না! কেউ কিছু বললে সোজাসুজি বলে দিতে কার্পণ্য বোধ করত না সে আমাকে ভালোবাসে।

ইন্টার ফাস্ট ইয়ার শেষ করে সেকেন্ড ইয়ারে যখন পড়ি। তখন পড়াশুনার চাপ বেড়ে গেল। নিয়মিত প্রাইভেট পড়তে যেতে হত। কিন্তু, তৌকিরের পাগলামি বেড়ে যাওয়াতে আমি বাসা থেকেই বের হতে চাইতাম না!
আমি চেয়েছিলাম ব্যাপারটা যেন আব্বুর কানে না পৌঁছায়। কিন্তু, ছোট চাচ্চু কোন উপায়ন্তর না দেখে আব্বু কে সবটাই বলে দেয়।

সুপ্তি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। আরিফ সাহেব কিংবা আমার কাছে রহস্য এখনো খোলাসা হয়নি। বুঝতে পারছি প্রকৃত হত্যাকারীর নৃশংস হওয়ার পিছনে লুকিয়ে থাকা অজানা কারণ জানতে পারা এখন শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার।

নীরবতা কাটিয়ে আরিফ সাহেব সুপ্তিকে জিজ্ঞেস করলেন;

-- তারপর কি হয়েছে?

সুপ্তি পুনরায় বলতে লাগল;

-- সবটা শুনার পর প্রথম দিকে বাবা পাত্তা দেয়নি। বাবা কে সেই ছোট থেকেই দেখছি রিসার্চের জন্য ফ্যামিলি কে সময় দিতে পারেনি। তার কাছে ব্যাপার'টা সামান্যই মনে হয়েছে। তাই বাবা আর এই ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

তৌকিরের পাগলামো প্রতিনয়ত বেড়েই চলছিল। তখন আর আমার পিছু পিছু ফলো করার প্রয়োজন মনে হয়নি। বাসা থেকে বের হলেই তাকে চোখের সামনে দেখে অবাক হওয়ার মত কিছুই ছিল না।

একদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে তৌকির আমার পথ আটকে দাঁড়ায়। রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করি;

-- আপনার সামস্যা কি? আমাকে এভাবে জ্বালাচ্ছেন কেনো?

তৌকির মুচকি দিয়ে বলে;

-- তোমাকে একটা কথা বলার ছিল!

-- কিন্তু আমি আপনার কথা শুনতে চাচ্ছি না।

তৌকির আবেগ্লাপুত হয়ে বলল;

-- তুমি কেনো আমাকে সহ্য করতে পার না? তুমি জানো না আমি তোমাকে কত ভালোবাসি।

আমি কিছু না বলেই চলে আসার সময় তৌকির আমার হাত ধরে পিছু টান দেয়। আমি রেগে গালে চড় মেরে চলে আসি।

এরপর থেকে তৌকির আমাকে মাত্রাতিরিক্ত জ্বালাতন করতে শুরু করে। যখন বাসা থেকে তৌকিরের জন্য বের হওয়া দুষ্কর হয়ে পরে। তখন আমি নিজেই বাবা 'কে সবটা খুলে বলি।

কিছুদিন পর আব্বু গ্রামে এসে তৌকিরের বাবার সাথে কথা বলে। তবুও তৌকিরের পাগলামো কমেনি। বরং আগের থেকে বেড়ে যায়। তৌকিরের পাগলামো মাত্রাতিরিক্ত দেখে ওর বাবা কে বলে দেয় এর পর যদি তার ছেলের পাগলামো না কমে তাহলে তার এমন পানিশমেন্ট দেয়া হবে যার জন্য তাকে সারা জীবন অস্বাভাবিক জীবন যাপন করতে হবে।

তৌকিরের বাবা চেষ্টা করেও ছেলেকে বোঝাতে পারেনি। যত ভয়ঙ্কর কিছুই হোক না কেনো তার আমাকেই প্রয়োজন! বাবা একদিন আমাদের না জানিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

সেদিনের পর থেকে নাকি তৌকির কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না! হন্যতন্য করে খুঁজেও তৌকিরের বাবা ছেলের কোন সন্ধান পায়নি! আমি এইচএসসি পরীক্ষা দেয়ার কিছুদিন পর বাবা গ্রামে গিয়ে আমাদের নিয়ে আসেন!

সুপ্তির কথা শেষ হতেই আরিফ সাহেব ভ্রুকুচকে জিজ্ঞেস করলেন;

-- তৌকির নিখোঁজ হয়েছিল কিভাবে?

সুপ্তির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল;

-- তৌকির নিখোঁজ হয়নি! আব্বু যেদিন আমাদের না জানিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন সেদিন তৌকির কে বাবা লোক দিয়ে ধরে এনে তার রিসার্চ ল্যাবে আটকে রেখেছিলেন! এরপর তৌকিরের সাথে আব্বু যেটা করেছিল তা ছিল অত্যান্ত ভয়ঙ্কর এবং কল্পনাতীত!

 

                                                          ১১তম পর্ব ঃ

সুপ্তি কে ভালোবাসার দরুন তৌকিরের কি এমন ভয়ঙ্কর পরিণাম হয়েছিল? তা জানার জন্য আরিফ সাহেব এবং আমি অধির আগ্রহ নিয়ে সুপ্তির কথা শুনে যাচ্ছি। আরিফ সাহেব সুপ্তি কে জিজ্ঞেস করলেন;

-- তারপর কি হলো?

নীরবতা কাটিয়ে সুপ্তি বলতে লাগল;

-- আব্বু হিউম্যান জেনেটিক্স নিয়ে রিসার্চ করতেন। আব্বুর রিসার্চ এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্য কোন একটি জীবের কোষ থেকে কোন কাঙ্খিত ডিএনএ কে রেস্ট্রিকশন এনজাইমের সাহায্যে কেটে নিয়ে অন্য কোষের ডিএনএ এর সাথে সংযুক্ত করে নতুন রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ উৎপন্ন করার মাধ্যমে মানুষ কে ঐ প্রাণীর ন্যায় শক্তিশালী এবং শারীরিক পরিবর্তন ঘটানো।

আব্বু তার বন্ধু লুইব ড্রোটেজ এর কাছ থেকে ভেরিয়ার প্রাণীর ডিএনএ অনুর কাঙ্খিত অংশ সংগ্রহ করেছিলেন। ভেরিয়া এমন এক প্রাণী যেটা শুধুমাত্র আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলেই দেখতে পাওয়া যায়।

ভেরিয়া প্রাণীর বৈশিষ্ট্য হলো, মুখটা লম্বাটে গায়ের রং তামাটে বা কালচে।খুব লোমশ প্রানী ও নিশাচর প্রানী।রাতে শিকার ধরতে পারদর্শী। ভেরিয়া খুব হিংস্রপ্রানী,মাংসাশী এবং রক্তখোর। চোখ দুটো বড় বড় এবং রক্তিম লাল রঙের। চোখের দৃষ্টি শক্তি অতি প্রখর হওয়াতে শত্রুদের খুব দূর থেকেই ভেরিয়া শনাক্ত করতে পারে! পায়ের নখগুলো বড় বড় এবং অন্য প্রাণীর তুলনায় অধিক শক্তিশালী হয়ে থাকে।

আব্বু অনেক দিন রিসার্চ এর মাধ্যমে ভেরিয়ারের ডিএনএ মানুষের দেহ প্রবেশ করানোর উপযোগী করে তোলে। কিন্তু, মানুষের দেহে প্রবেশ করানো ছিল অধিক রিস্কি। কেননা, যদি সম্পূর্ণভাবে আব্বুর রিসার্চ সফল না হয় তাহলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাছাড়া, এমন রিসার্চ মানুষের উপর প্রয়োগ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়াতে আব্বু রিসার্চের এক্সপেরিমেন্ট করতে পারেনি!

তৌকির কে ধরে আনার পিছনে আব্বুর একটাই উদ্দেশ্য ছিল। আর সেটা হলো তার উপর আব্বুর রিসার্চের এক্সপেরিমেন্ট প্রয়োগ করা। তৌকিরের ডিএনএ পরিবর্তন করে তাকে সম্পুর্ণ ভেরিয়ার ন্যায় অর্থাৎ তাকে ভেরিয়ারের জিন ক্লোনিং তোইরি করা। যদি আব্বু এই রিসার্চে সফল হয় তাহলে তার নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরবে। এমন কি জেনেটিক্স এ এক নতুন অধ্যায় যুক্ত হবে।

পরিকল্পনা মাফিক আব্বু তার সহকারীকে নিয়ে তৌকিরের উপর ভেরিয়ার ডিএনএ দিয়ে তার করা রিসার্চের এক্সপেরিমেন্ট শুরু করে। প্রথমে তৌকিরের শরীর থেকে টার্গেটকৃত ডিএনএ নির্বাচন করে তা আলাদা করে নেয়। একটি বাহক নির্বাচন করে যার মাধ্যমে ভেরিয়ার কাঙখিত ডিএনএ খন্ডটি প্রতিস্থাপন করা হয় তৌকিরের শরীরে। সম্পুর্ণ আলো বাতাসহীন বদ্ধ ঘরে তাকে আটকে রাখা হয়। কেননা এ সময় সূর্যের আলো তৌকিরের শরীরে পরলে তার মৃত্যু অব্দি হতে পারে। এর কয়েক সপ্তাহ পর তৌকিরের শরীরে পরিবর্তন আস্তে শুরু করে।

ভয়ঙ্কর এই এক্সপেরিমেন্টের ফলে তৌকির বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তার চোখ, মুখ, এবং হাতের নখগুলো সম্পূর্ণ ভেরিয়া প্রাণীর মত হয়ে যায়! তৌকিরের চোখ গুলো সাধারণ মানুষের মত ছিল না। ভেরিয়ারের ন্যায় টকটকে লাল রঙে পরিণত হয়। মুখের উপরের চোঁয়াল থেকে সামনের দুটো দাঁত অস্বাভাবিক ভাবে বড় হয়ে বাহিরে বের হয়ে আসে। হাতের নখ গুলো তিন ইঞ্চির মত বড় হয়ে শক্ত হয়ে যায়।

তৌকিরের উপর করা এক্সপেরিমেন্টে আব্বু সফল হয় ঠিকই। কিন্তু, আব্বুর জানা ছিল না এই এক্সপেরিমেন্টের ফলে তৌকির হয়ে উঠবে এতোটা বিভৎস, ভেরিয়ারের ন্যায় ভয়ংকর ও শক্তিশালী রক্তচোষা প্রাণী!

এতটুকু বলেই সুপ্তি থেমে গেল। অপরাধবোধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আরিফ সাহেব কে বললেন;

-- বিশ্বাস করুণ স্যার! আব্বুর খারাপ কোন উদ্দেশ্য ছিল না। আব্বু শুধু চেয়েছিল তার এত দিনের পরিশ্রমের রিসার্চ এক্সপেরিমেন্ট করা। তৌকিরের উপর সেই এক্সপেরিমেন্ট করে সফল হতে চেয়েছিলে।

আরিফ সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন;

-- তার পরবর্তী ঘটনা বল!

সুপ্তি পুনরায় বলতে লাগল;

-- একদিন আব্বু ল্যাবে গিয়ে দেখতে পায় ল্যাবে থাকা ইন্সট্রুমেন্ট সব ভেঙে ফেলা হয়েছে। ল্যাবে যেই বিশেষ সিকিউরিটি কাচবদ্ধ রুমে তৌকিরকে রাখা হয়েছিল সেটাও ভেঙে ফেলা হয়েছে। রুমের পাশে তাকাতেই আব্বুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরার মত অবস্থা! আব্বুর সহকারীর লাশ পরে আছে। আশপাশ রক্তের ছোপ ছোপ রক্ত দেখে আব্বু ভয়ে আতকে ওঠে।

আব্বু তার সহকারীর বিভৎস লাশ দেখে বুঝতে বাকী রইল না এটা কার কাজ হতে পারে। তৌকিরের মধ্যে ভেরিয়ারের বৈশিষ্ট কাজ করতে শুরু করেছে। তাই সে সহকারীকে বিভৎস ভাবে হত্যা করে পালিয়ে গেছে। আব্বু বেশ চিন্তিত হয়ে পরলেন। কেননা, তৌকির এখন ভেরিয়ারের ন্যায় রক্ত পিপাসু এবং হিংস্র হয়ে উঠেছে। তাছাড়া, তৌকির কে পুনরায় পূর্বের অবস্থায় আব্বুই শুধু ফিরিয়ে আনতে পারবে!

সুপ্তির কথা শেষ হতে আরিফ সাহেব গম্ভীর কন্ঠে বললেন;

-- তারমানে এইসব বিভৎস হত্যার প্রকৃত হত্যাকারী তৌকির?

সুপ্তি মাথা নিচু করে বলল;

-- জ্বী স্যার!

আরিফ সাহেব কিছুক্ষণ ভাব গম্ভীর হয়ে ভাবলেন। ভাবনা শেষে জিজ্ঞেস করলেন;

-- সবই বুঝলাম। কিন্তু, তৌকির যদি প্রতিশোধ নিতেই হত্যা করে থাকে তাহলে তো তোমার বাবা এবং তোমার উপর প্রতিশোধ নিতে চাইবে। কিন্তু তা না করে সে ওদের হত্যা করল কেন?

সুপ্তি বলল;

-- স্যার, গ্রামে থাকতে তৌকির বলেছিল। আমি যদি তার না হই তাহলে আমি কারো হতে পারব না। আমার আশপাশে খুব কাছে যারা থাকবে তাদের কাউকেই সে ছাড়বেনা! শহরে আসার পর ভার্সিটিতেই আমার ওদের সাথে পরিচয় হয়। আমরা সাত জন সব সমই এক সাথে থাকতাম। সাত জন কে নিয়েই আমাদের ক্লোজ ফ্রেন্ড সার্কেল। তাই তৌকির আমার খুব কাছের বন্ধুদের বিভিৎস ভাবে হত্যা করেছে!

আরিফ সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বললেন;

-- আলভী, সবটাই তো শুনলে। এখন আমাদের দ্রুত তৌকির কে জীবিত অবস্থায় ধরতে হবে।

আরিফ সাহেবের কথা শেষ হতেই বললাম;

-- কিন্ত স্যার, সেটা কিভাবে সম্ভব?

আরিফ সাহেব বললেন;

-- ঠিক তিন দিন পর তৌকির তোমাদের মধ্যে বেঁচে থাকা তিন জনের মধ্যে যে কাউকে টার্গেট করবে। কাকে টার্গেট করতে পারে তা আমাদের ভাবনা চিন্তার বাহিরে। তাই আমাদের সাবধানতার সাথে তৌকির কে ধরার ফন্দি আঁটতে হবে।

আরিফ সাহেবের কথা একমত পোষণ করে সুপ্তি বলল;

-- জ্বী স্যার, আপনি যেটা বলেছেন সেটাই উত্তম হবে।

আরিফ সাহেব ভেবে চিন্তে তৌকির কে ধরার প্লান আমাদের বুঝিয়ে দিলেন।

তৌকির রক্তচোষা হিংস্র প্রাণী হওয়ার পিছনে লুকিয়ে থাকা অজানা রহস্য আমাদের সামনে খোলাসা হয়ে গেল। একের পর বিভৎস হত্যার পিছনে যেই আসল রহস্য লুকিয়ে ছিল তার জন্য সুপ্তির বাবা ইমতিয়াজ রকিব দায়ী। সে যদি তৌকিরের উপর এমন ভয়ঙ্কর এক্সপেরিমেন্ট না করত তাহলে হয়তো আজ তৌকির এত হিংস্র হয়ে উঠত না। এটা হয়তো ঠিক যে, রকিব সাহেবের উদ্দেশ্য হয়তো এমন টা ছিল না। তবুও সে অপরাধী। বিন্দুমাত্র দায়ভার এড়ানোর সাধ্য তার নেই!

সুপ্তির জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা কিংবা তৌকিরের সুপ্তির প্রতি পাগলামোর কথা শুনে বুঝতে পারলাম সুপ্তি কে তৌকির প্রচণ্ড ভালোবাসত। কিন্তু, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়াতে সুপ্তির কাছে সে বরাবর-ই অবহেলিত ছিল। আচ্ছা, তৌকির কে সুপ্তির কেনো পছন্দ হয়নি? মধ্যবিত্তের ছেলে বলেই নাকি বোকাসোকা টাইপের ছিল বলে?

কাউকে ভালোবাসতে একটা সুন্দর মন থাকা দরকার। সেটা হয়তো তৌকিরের ছিল কিন্তু সুপ্তির হয়তো সেই সুন্দর মন তখন হয়তো ছিল না। কিংবা ভালোবাসার ফিলিংস তখন হয়তো সুপ্তির ভিতর কাজ করত না। সে যাই হোক! এখন এসব ভেবে আর কি লাভ? যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন আমাদের লক্ষ্য তিথীর মৃত্যুর তৃতীয় দিন রাতে তৌকির কে জীবিত অবস্থা ধরতে পারা!

ভয়ভীতি এবং আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দু'দিন পার হয়ে গেল। সুপ্তির বাবার তৌকিরের উপর ভয়ঙ্কর এক্সপেরিমেন্টের কথা মাথায় আসলেই গা শিউরে উঠে। সাইন্টিস্টের একমাত্র কন্যাকে ভালোবাসার পরিণতি এতটা বিভৎস হতে পারে!

আরিফ সাহেব, প্লান অনুযায়ী তৌকির কে ধরার প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেছেন। রক্তের পিপাসায় কিংবা প্রতিশোধের নেশায় তৌকির যাতে আর কোন বিভৎস হত্যা না করতে পারে তার জন্য সব রকমের সহযোগীতা প্রশাসন করার আশা ব্যক্ত করেছেন। আরিফ সাহেবের চাকুরী জীবনে হয়তো এটাই সবচাইতে রহস্য জনক কেইস। কিন্ত, এই কেইসের জন্য তাকে উর্ধতন কর্মকর্তাদের কম কথা শুনতে হয়নি।

কাল রাত হয়তো তৌকিরের এহেন বিভৎস প্রতিশোধ নেয়ার শেষ রাত। প্লান যদি ভেস্তে যায় তাহলে হয়তো আমাদের মৃত্যুও হিংস্র হয়ে উঠা তৌকিরের হাতে বিভৎস মৃত্যুর স্বীকার হতে হবে বেঁচে থাকা তিনজনের মধ্যে কোন একজন। আমিও কিন্তু তাদের মধ্যে একজন!!

 

                                                     অন্তিম বা শেষ পর্বঃ
.
রাত দুইটা বেজে দশ মিনিট। বাসায় সুপ্তি ছাড়া আর কেউ ই নেই। সুপ্তির মনে ভয়, আতঙ্ক কাজ করছে। এই বুঝি তৌকির এসে তার গলায় চিকন চিকন দাঁত বসিয়ে রক্তচুষে পান করছে। ভালোবাসার ভয়ঙ্কর পরিণামের প্রতিশোধ নিতে পেরে তৌকির অট্টহাসিতে ফেটে পরছে। এই সব ভাবনায় ভয়ে সুপ্তি খাটের কোণায় গিয়ে জড়সড় হয়ে বসে রইল।

নিস্তব্ধ বাসায় ঘড়ির সেকেন্ডের কাটার টিকটিক শব্দটাও বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। আকষ্মিক রুমের দরজা নক করার শব্দ পেয়েই সুপ্তির প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সুপ্তি নড়াচড়া না করে বসে রইল। দরজায় কড়া নাড়বার শব্দ আরো প্রকট হতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আপনা আপনিই শব্দ থেমে গেল।

হঠাৎ করেই বিকট শব্দে রুমের দরজা খুলে গেল। সুপ্তি এক দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্ধকার রুমে, বাহির থেকে বাতির কিছুটা আলো রুমের দরজার সামনে ফ্লোরে পরল। সুপ্তির চোখ যেন সেই আলোতেই আটকে আছে।

এক পা দু'পা করে একটি অবয়ব রুমের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখেই সুপ্তির গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। আবছা আলোয় অবয়টির মুখমণ্ডল ছাড়া সব কিছুই দেখা যাচ্ছে। চুল গুলো উশকো খুশকো বড়। অস্বাভাবিক ভাবে হেটে আসছে।

সুপ্তি ভাবল, তাহলে কি রক্তচোষা তৌকির এসেছে? যদি তাই হয় তাহলে তো তার আজ রক্ষা নেই! তার রক্তচুষে ঘাড় মচকে দেয়া হবে। সুপ্তি এসব যখন ভাবছিল তখন দেখল অবয়বটি দরজা থেকে একটু ভিতরে এসেই থেমে গেল। মনে সাহস জুগিয়ে সুপ্তি জিজ্ঞেস করল;

-- কে? কে এখানে?

অবয়বটি কোন কথা না বলে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

অবয়বটিকে এভাবে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সুপ্তি বেশ অবাক হলো। যদি তৌকির-ই হয়ে থাকে তাহলে তো এভাবে দাঁড়িয়ে থাকত না! হিংস্র জন্তুর ন্যায় নখের আঁচড়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত করে ঘাড় থেকে রক্তচুষে নিত। তেমন তো কিছুই হচ্ছে না। তাহলে কি এটা তৌকির নয়?

সুপ্তি পাশে দেয়ালে থাকা রুমের লাইটের সূইচে হাত বাড়িয়ে চাপতে পুরো রুম আলোকিত হয়ে গেল। যেই অবয়বটি রুমে ছিল সামনে তাকিয়ে দেখে সে তৌকির ছাড়া অন্য কেউ নয়। লোমশ শরীর নিয়ে তৌকির দাঁড়িয়ে আছে।

তৌকিরের চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করছে কিন্তু চোখে কোন ক্ষোভ নেই। মুখের উপর চোঁয়ালে থাকা দুটো দাঁত সামনে বেড়িয়ে আছে কিন্তু ঘাড়ে কামড় বসানোর জন্য খটখট করছে না। দু'হাতের তিন ইঞ্চি নখগুলো শরীরের পিছনে নিয়ে রাখা। তৌকির তার মাথা নিচু করে সুপ্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে!

সুপ্তির চোখের সামনে পাঁচ জন বিভৎস হত্যার প্রকৃত হত্যাকারী দাঁড়িয়ে আছে। অথচ তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এমন বিভৎস ভাবে হত্যা করতে পারে। সুপ্তি খাট থেকে নেমে তৌকিরের সামনে এসে দাঁড়াল। রাগান্বিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল;

-- বাহ! বিভৎস ভাবে রক্তচোষা হত্যাকারী আমার সামনে দাঁড়িয়ে। অথচ আমাকে সে কিছুই বলছে না! নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? এই দেখ! আমি তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। আমার রক্তচুষে প্রতিশোধের আগুন নেভাও। আমার জন্যই তো আমার বন্ধুদের মেরেছ। এখন না হয় আমাকে মার!

তৌকির কোন কথা না বলে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেভাবে সুপ্তির সামনে দাঁড়িয়ে আছে মনে হচ্ছে সে তার কৃতকর্মের জন্য বেশ অনুতপ্ত। বড় বড় নিশ্বাস ছাড়ায় ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে।

সুপ্তি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল;

-- সেই কলেজ লাইফ থেকে তুমি আমার পিছু নিয়েছো। এখনো সেই আমার পিছুই পরে রয়েছ!

তোকির কিছু একটা বলতে চাচ্ছে, কিন্তু বাকরুদ্ধ হওয়াতে কিছুই বলতে পারছে না! তার এমন নীরবতা সুপ্তিকে বেশ অবাক করছে। আকষ্মিক তৌকিরের চোঝ পরে দেয়ালে টাঙানো ফ্রেমে থাকা ছবির দিকে। সাথে সাথে চোখ গুলো তার জ্বলজ্বল করে উঠল। তৌকিরের হিংস্র ভাব জেগে উঠতেই এগিয়ে গিয়ে দেয়ালে টাঙানো ছবির ফ্রেম হাতে নিয়ে ফ্লোরে ছূড়ে মারতেই কাঁচগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পরল। সুপ্তি ফ্লোরে তাকাতেই দেখল ফ্রেমে বাঁধানো তার বাবার ছবি পরে আছে। সুপ্তি বুঝতে পারল তৌকিরের মধ্যে হিংস্র ভাব জেগে উঠেছে।

এক পা দু'পা করে তৌকির এগিয়ে যাচ্ছে সুপ্তির দিকে। হিংস্র ভাব জেগে উঠায় তৌকিরের আসল চেহারা ফুঠে উঠেছে। বড় বড় নখ থাকা হাত সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। নাহ, এখন আর এক মুহূর্তের জন্যেও অপেক্ষা করা যাবে না! আরিফ সাহেব তার ফোর্স কে পুরো বাসার বাহির ঘিরে ক্লোজ হতে বলেই সুপ্তির রুমের বাহিরে তার সাথে থাকা ৫ জন সহ হাসিব কে আর আমকে নিয়ে সুপ্তির রুমে প্রবেশ করলেন। আমাদের দু'জন কে পিছনে থাকতে বলে আরিফ সাহেবের সাথে থাকা পাঁচ জন কে অস্ত্র তাঁক করে ভিতরে যেতেই তৌকির পিছু ঘুরে তাকাল। তার চোখমুখে প্রতিশোধের নেশা স্পষ্টত।

আরিফ সাহেব দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বললেন;

-- তৌকির, তোমাকে ফোর্স ঘিরে ফেলেছে। পালিয়ে যাওয়ার সব পথ এখন বন্ধ!

আরিফ সাহেব ইশারায় সুপ্তিকে চলে আসতে বললেন। সুপ্তি বুঝতে পেরে যেই না পা বাড়িয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে তৌকির হাত টেনে ধরল। সুপ্তি প্রাণপণ চেষ্টা করছে হাত ছাড়িয়ে নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তৌকির এখন যে কোন কিছুই করতে পারে এটা বুঝতেই আরিফ সাহেব তার হাতে থাকা গান তৌকিরের দিকে তাক করলেন। রাগে তৌকির গজগজ করতে লাগল। ক্রিটিক্যাল অবস্থা দেখে আরিফ সাহেব তৌকিরের বা পায়ে শ্যূট করতেই তৌকির মাটিয়ে লুটিয়ে পরল। সুপ্তি দৌড়ে আমাদের কাছে এসেই কান্না করতে লাগল।

তৌকির কে পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সুপ্তির বাবা ইমতিয়াজ রকিবের ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হল। একমাত্র রকিব সাহেব পারেন তৌকির কে সুস্থ করতে। তৌকিরের শরীর থেকে ভেরিয়ারের কাঙ্খিত সেই ডিএনএটি রেস্ট্রিকশন এনজাইম দ্বারা কেটে নেয়া হল এবং তৌকিরের ছেদনকৃত ডিএনএটি পুনরায় লাইগেজ এনজাইম এর সাহায্যে জোড়া লাগানো হলো। তৌকিরের জীব কোষ থেকে ভেরিয়ারের ডিএনএ অণু সম্পুর্ণভাবে পৃথক এর জন্য তৌকিরের কোষকে লাইসিস করা হলো এবং কোষের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রোটিন, শর্করা, লিপিড প্রভৃত অণু হতে ভেরিয়ারের ডিএনএ অণুকে রাসায়নিক পদ্ধতিতে পৃথক করা হলো। তৌকিরের সুস্থ হতে একমাস লাগতে পারে বলে রকিব সাহেব জানালেন। সম্পুর্ণ সুস্থতার জন্য তার রক্তে একটি এন্টিডোট ইঞ্জেকশন দিলেন রাকিব সাহেব।

রকিব সাহেবের ভয়ঙ্কর এক্সপেরিমেন্টের ফলে তৌকির ভেরিয়ারের বৈশিষ্ট্যে অসুস্থ অবস্থায় বিভৎস পাঁচ খুন করার পরেও তাকে কোর্ট মুক্তি দিলেও রকিব সাহেবের ভয়ঙ্কর এক্সপেরিমেন্টের জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করে দশ বছর কার

রকিব সাহেবের রায় শুনে সুপ্তি অনেকটা ভেঙে পরল। তার বাবার করা ভুলের জন্যই এক এক করে পাঁচ বন্ধুর বিভৎস মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে থাকতে হল।

দেখতে দেখতে ২ মাস কেটে গেল। এখন আর রক্তচোষার জন্য রাতের ঘুম হারাম হয় না। রক্তচোষার করা বিভৎস হত্যা দেখে শরীর লোম দাঁড়িয়ে যায় না। কিন্তু রক্তচোষা ঠিকই জীবন থেকে কাছের পাঁচ বন্ধুকে কেড়ে নিয়েছে। রেখে গেছে বিভৎস কিংবা ভয়ঙ্কর পনেরো দিনের স্মৃতি। যে স্মৃতির কথা মনে পরল এখনো শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। বুকের মাঝে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হয়!

হঠাৎ একদিন সুপ্তি কল দিয়ে পার্কে দেখা করতে বলল। সেই চিরচেনা পার্ক! যেখানে সুপ্তি আর আমি প্রায় দেখা করতে আসতাম। পরিচিত পার্ক আজ কেনো জানি অপরিচিত মনে হচ্ছে। পার্কে সেই বেঞ্চটির সামনে আসতেই দেখি সুপ্তি দাঁড়িয়ে আছি। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম;

-- কেমন আছিস?

সুপ্তি অভিমানী কণ্ঠে বলল;

-- যেমনটা রেখেছিস!

আমি মুচকি হেসে বেঞ্চে বসলাম। সুপ্তি কে চুপ থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম;

-- দিনকাল কেমন কাটছে?

-- এত দিন পর দেখা করতে এসে এসব প্রশ্নে করা কতটুকু যুক্তিসংগত?

আমি নিশ্চুপ হয়ে রইলাম। নীরবতা কাটিয়ে সুপ্তিকে জিজ্ঞেস করলাম;

-- সুপ্তি, তুই আমাকে কতটুকু ভালোবাসিস?

সুপ্তির আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল;

-- যতটা ভালোবাসলে কাউকে আঁকড়ে ধরে বাকী জীবন বেচে থাকার ইচ্ছে হয়। ঠিক ততটাই!

আমি মুচকি হেসে বললাম;
-- আমি যদি ভালোবেসে তোকে কোন উপহার দিতে চাই তুই ফিরিয়ে দিবি না তো?

-- ফিরিয়ে দিব কেনো? তুই যা দিবি আমি সেটা নিজের কাছে যত্ন করে রাখব!

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে সুপ্তি কে বললাম;

-- তাহলে চল! আমি আজ তোকে সব চাইতে মূল্যবান উপহার তোর হাতে তুলে দিব।

সুপ্তি আগ্রহ নিয়ে আমার সাথে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করল। দু'জন হেটে যাচ্ছি কাঙ্ক্ষিত সেই মূল্যবান সুপ্তির হাতে তুলে দেয়ার জন্য!

পার্কের শেষ প্রান্তে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। সুপ্তি কে নিয়ে খুব কাছে চলে গেলাম। কাঁধে হাত রাখতেই ছেলেটা পিছু ফিরে তাকাল। সুপ্তি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। অবাক হবার-ই কথা! কেননা, ছেলেটা আর কেউ নয় তাকে পাগলেরর মত যেই ছেলেটি ভালোবাসতো সেই তৌকির আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে। সুপ্তি বুঝতে পারছে না আমি ঠিক কি চাচ্ছি। কিন্তু, আমি যেটা চাচ্ছি সেটা হয়তো সুপ্তির কল্পনার বাহিরে।

তৌকিরের হাত সুপ্তির হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে সুপ্তি কে বললাম;
-- আমার পক্ষ থেকে তোকে সবচাইতে মূল্যবান উপহার আমি তোর হাতে তুলে দিলাম। কথা দিয়েছিস, সারা জীবন তোর কাছে যত্ন করে আগলে রাখবি!

সুপ্তি কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হেটে আসলাম। খুব ইচ্ছে করছে হাতে হাত রাখা মুষ্টিবদ্ধ দু'জন এক পিছু ফিরে একপলক চেয়ে দেখি। নাহ, তাকিয়ে দেখে কষ্ট বাড়ানোর কোন মানেই হয় না!

সুপ্তির প্রতি তৌকিরের পাগলামো ভালোবাসার কাছে আমার ভালোবাসা অতি তুচ্ছ! সুপ্তি কে আমিও ভালোবাসি। কিন্তু, তৌকিরের মত করে সুপ্তি কখনোই ভালোবাসতে পারব না! যেই ছেলেটা সুপ্তিকে পাগলের মত ভালোবাসার দরুন এতটা বিভৎস হয়েও বিন্দুমাত্র ক্ষতি করেনি। যাকে পাগলের মত ভালোবাসলে সব কিছু সহ্য করা যায়। তার ভালোবাসা কে অপমান করে কিভাবে আমি নিজের স্বার্থ পূরণ করব?

রক্তচোষা মানুষটি সুস্থ জীবন ফিরে পেয়েছে। ফিরে পেয়েছে ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে। তার জীবনের বাকী সময় টুকু কাটুক ভালোবাসার মানুষটির হাতে হাত রেখে!

কিছু সুখের স্মৃতি, কিছু বিভৎস স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকব বাকিটা জীবন। অশ্রুহাসিতে সব গ্লানি মুছে যাবে। " রক্তচোষার " নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হবে!

_______________ সমাপ্ত

 


( আলহামদুলিল্লাহ! সবার উৎসাহ, অনুপ্রেরণায় " রক্তচোষা " গল্পটির ইতি টানলাম। শুরু থেকেই গল্পটির জন্য অনেকেই পুরো একদিন অপেক্ষা করতেন! গল্প লিখার স্বার্থকতা তখন বুঝতে পারি যখন বুঝতে পারলাম সবাই অধির আগ্রহ নিয়ে গল্পের প্রতিটি পর্বের জন্য অপেক্ষা করে। " রক্তচোষা " গল্পটি হরর, মিস্টোরি, সাইন্সফিকশন ক্যাটাগরি জোন দিয়ে সাজানো ছিল! ভার্চুয়ালে গতানুগতিক গল্প থেকে বেড়িয়ে এসে ব্যতিক্রমী গল্প লিখতে চেয়েছি। কতটা সফল হয়েছি তা হয়তো আপনারাই ভালো বলতে পারবেন। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছি আপনাদের সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী গল্প উপহার দিতে। আপনাদের অনুপ্রেরণায় নিয়মিত গল্প লিখার চেষ্টা থাকবে। আমার লেখা পরবর্তী গল্প খুব শীঘ্রই পাবেন। সবার প্রতি ভালোবাসা অবিরাম )