ইয়াবার চেয়ে ৫০ গুণ ক্ষতিকর মাদক ‘আইস’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও অভিযানের কারণে ইয়াবার বিকল্প মাদক আবিষ্কার করেছে ব্যবসায়ীরা। বাজারে ঢুকেছে নতুন ভয়ংকর মাদক আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। ইয়াবার চেয়েও ৫০ গুণ বেশি ক্ষতি হয় আইসে। এর দামও বেশি, মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি।

আসক্তদের যৌনক্ষমতা, কিডনি, লিভারসহ অঙ্গ-প্রতঙ্গ নিমেষেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হয়ে ওঠে। স্বভাব হয়ে যায় হিংস্র। হত্যাসহ যেকোনো অপরাধ করতে তারা দ্বিধা করে না।

সমাজে চরম নিষ্ঠুরতা-নির্মমতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তরুণ সমাজকে দ্রুত গ্রাস করে ফেলছে সর্বনাশা মাদক। তাই ভয়ংকর এই মাদক নির্মূলে এখনই সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ইয়াবার বিকল্প হিসেবে বাজারে খাট বা এনপিএসের পর আবির্ভাব ঘটল আইস বা ক্রিস্টাল মেথ নামক নতুন এই মাদকের।

বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, ‘আইস’ লবণের মতো দানাদারজাতীয় মাদক। দেখতে কখনো চিনির মতো, কখনো মিছরির মতো। আইস উচ্চমাত্রার মাদক, যা সেবনের পর মানবদেহে দ্রুত উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই মাদক সেবনের পর মস্তিষ্ক বিকৃতিতে মৃত্যু হতে পারে। তাছাড়া অনিদ্রা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম ও হূদেরাগকে বেগবান করে।

এই মাদক সয়লাব হলে ইয়াবার চেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশের তরুণ সমাজ। স্ক্যানিংয়ে ধরা পড়ছে না আইস। এই মাদক শরীরে প্রবেশ করলে আর ছাড়ে না বলে অভিমত দেন বিশেষজ্ঞরা। জানা গেছে, আইস নিয়ে চরম বিপাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। কারণ এটি শনাক্ত করা কঠিন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যেই চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন মাদক হিসেবে আবির্ভূত হয় ক্রিস্টাল মেথ বা আইস। এরপরই নড়েচড়ে বসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) মাসুদ রব্বানী জানান, ‘সম্প্রতি উত্তরায় একজন নাইজেরিয়ানকে ছয় গ্রাম আইসসহ আটক করা হয়, যা দিয়ে ৫০ হাজার ইয়াবা তৈরি করা সম্ভব। এটা একটা নীরব ঘাতক। নতুন এই মাদক নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। তবে আমরা সতর্ক আছি। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।’

প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল জানান, আইস মাদকে ক্ষতিকর সবকিছু আছে। নতুন এই মাদক তরুণ ও যুবসমাজকে ধ্বংস করে দেবে। রাজনৈতিক অঙ্গনকেও ধ্বংস করে দেবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, সবাইকে নতুন মাদক আইস নির্মূলে এগিয়ে আসতে হবে। ঘরে ঘরে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

তেজগাঁও কেন্দ্রীয় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের চিকিত্সক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রায়হানুল ইসলামও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, সময় থাকতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি জিগাতলার ৭/এ নম্বর সড়কের একটি বাসায় আইসের সন্ধান পায় তারা। অভিযানে ওই ভবনের বেজমেন্টে মাদক তৈরির অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরির সন্ধানও মেলে। ওই ল্যাব থেকে ৫ গ্রাম আইসসহ জাহাঙ্গীর আলম (৫৯) নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়। মাদক সরবরাহের মূল হোতা হাসিব মোয়াম্মার রশিদকেও (৩২) গ্রেফতার করা হয়। ওই ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় মামলা হয়। আটক জাহাঙ্গীর আলমের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে, আইস মূলত চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়ায় প্রচলিত। গ্রেফতার হাসিব মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করতেন। সেখান থেকেই তিনি আইস সম্পর্কে ধারণা পান। কী কী রাসায়নিকের মাধ্যমে আইস তৈরি করতে হয়, সেই কৌশল রপ্ত করেন তিনি ।

বাংলাদেশি এক নাগরিক এই নতুন মাদক আমদানিতে জড়িত বলে তথ্য মিলেছে। তার নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলেও পলাতক থাকায় গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রোর গোয়েন্দা টিম জানতে পারে, নতুন মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) বাংলাদেশের বাজার ধরার জন্য বিভিন্ন আফ্রিকান মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা দল গত ২৭ জুন ফাঁদ পেতে নাইজেরিয়ান ড্রাগ ডিলার আজাহ আনায়োচুকওয়া অনিয়েনওয়াসিকে খিলক্ষেত থেকে গ্রেফতার করে।

জানা গেছে, নাইজেরিয়ান নাগরিক আজাহ আনায়োচুকওয়া অনিয়েনওয়াসি স্টুডেন্ট ভিসায় বাংলাদেশে আশা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করেন। এর আড়ালে তার মূল ব্যবসা ছিল আইস। শুধু বাংলাদেশেই নয়, আরও সাত-আটটি দেশে আইসের ডিলার হিসেবে ব্যবসা করে আসছিলেন তিনি। তার মাধ্যমে চারজনের নাম-পরিচয় জানা গেছে। তাদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। তার বিরুদ্ধে গত ২৮ জুন ভাটারা থানায় মামলা করা হয়। গ্রেফতার দেখানোর পর গত ৪ জুলাই আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নাইজেরিয়ানসহ অন্য কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জানা গেছে, ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান অ্যামফেটামিন। ইয়াবায় থাকে ২০-২৫ শতাংশ অ্যামফেটামিন। আইসও তৈরি হয় অ্যামফেটামিনে। তবে আইসে অ্যামফেটামিন ব্যবহার করা হয় শতভাগ, যে কারণে ইয়াবায় যে ক্ষতি তার চেয়ে বেশি ক্ষতি আইস সেবনে। একবার আইস সেবন শুরু করলে আর এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। যে কারণে একবার এটি সেবন শুরু হলে ওই আইসসেবী যেকোনো অপরাধকর্মের মাধ্যমে টাকা জোগানোর চেষ্টা করবে। ইতিমধ্যে একটা সীমিত ক্রেতাশ্রেণিও তৈরি হয়েছে।