যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিরা বার বার পরাজিত হয়েছে আওয়ামী লীগের কাছে

৭০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগই প্রধান এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, জন্মলগ্ন থেকেই একের পর এক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা
করে আওয়ামী লীগকে তার রাজনৈতিক প্রচারাভিযান এগিয়ে নিতে হয়েছে। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কখনোই ফাঁকা মাঠে গোল দিতে পারেনি। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর থেকে বার বার শক্তিশালি প্রতিপক্ষর সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে, এগিয়ে যেতে হয়েছে সামনের দিকে।

রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ কারা এবং কীভাবে ছিল? সেই প্রতিপক্ষদের কীভাবে আওয়ামী লীগ পরাজিত করলো দেখা যাক:

*মুসলিম লীগ:* আওয়ামী লীগ যখন রাজনীতি শুরু করেছিল, সেই জন্মলগ্নে প্রথম বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল তৎকালীন পাকিস্থানের ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার। মূলতঃ মুসলিম লীগ সরকারের অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদ জানাতেই আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল। শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ নির্যাতন, নীপিড়ন এবং নিষ্পেষণের শিকার হয়েছিল। কারণ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে দাঁড়াতে দিতে চাচ্ছিল না। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যেন বিকশিত না হতে পারে সেজন্য যা যা করার দরকার, তার সবই করেছিল ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দিনের পর দিন কারাবরণ,
জেল জুলুম নীপিড়ন নির্যাতনের ইতিহাস যারা বিন্দুমাত্র জানেন, তারাই জানেন যে আওয়ামী লীগের ওপর কী বিভৎস রকম নীপিড়ন হয়েছিল সেই সময়টায়। কিন্তু মুসলিম লীগের এই নীপিড়ন আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে পারেনি, বিন্দুমাত্র টলাতে পারেনি লক্ষ্য থেকে। বরং মুসলিম লীগই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের নাম নিশানা মুছে দিয়েছে বাংলাদেশের জনগণ। ৭০ এর নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম লীগকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

*জাসদ:* স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মাথাচাড়া দিয়েছিল জাসদ। বাইরে বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রের সাইনবোর্ড ধারণ করলেও জাসদ মূলত ছিল স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এবং বিভ্রান্ত বামদের এক প্লাটফর্ম। এই জাসদই জ্বালাও পোড়াও এবং নানা রকম কুৎসা রটানোর মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হ্রাসের ক্ষেত্রে জাসদের প্রপাগাণ্ডা মিথ্যাচার এবং ভ্রান্ত রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বিশেষকরে জাসদের গণবাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটিয়েছিল। যার দায় উঠেছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, ৭৫ এর ১৫ আগস্ট এর পটভূমি তৈরীতে জাসদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু এই জাসদও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। জাতির পিতার মৃত্যুর পর জাসদের
অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কর্ণেল তাহেরও জিয়াউর রহমানের নির্মমতার শিকার হন এবং জাসদ দিকভ্রান্ত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। এখন বহু বিভক্ত জাসদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূল্যহীন। দুটি অংশ আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে কোনরকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে তাদের বিন্দুমাত্রও গুরুত্ব নেই। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এই প্রতিপক্ষও আজ পর্যুদস্ত।

*বিএনপি:* বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ৩য় প্রতিপক্ষ বিএনপি। মূলতঃ ৭৫ এর ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী হিসেবে বিএনপি আত্মপ্রকাশ করে। বিএনপির প্রধান লক্ষ্যই ছিল আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করে দেওয়া। জিয়াউর রহমান তার বিভিন্ন বক্তৃতায় বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ নামের কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকবে না। শুধু জিয়াউর রহমান না, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির চেয়ারপার্সনের দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়াও ঘোষণা করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব বিলীন করতে হবে এবং দেশে আওয়ামী লীগ নামে কোনো রাজনৈতিক দল থাকবে না। এ প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া ২০০১ সালের ২৩ জুন এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘এবার নৌকাকে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে।’ ১৯৮১ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়েছিল বিএনপি। এ পর্যন্ত বিএনপি আওয়ামী লীগের প্রায় দেড় লাখ নেতাকর্মীকে হত্যা করেছিল বলে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে জানা যায়। ৭৫ এর পর থেকে ৮১ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রায় ৮ লক্ষ নেতাকর্মীকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। এই সবকিছু করার পরও রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ এবং স্বাধীনতা
বিরোধীদের প্রধান আশ্রয়স্থল বিএনপি এখন নিজেরাই রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আওয়ামী লীগ তার প্রবল প্রতিপক্ষকে শুধু জনগণের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে এবং ভোটের রাজনীতিতে রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

*জাতীয় পার্টি:* আওয়ামী লীগের স্বল্পকালীন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল জাতীয় পার্টি। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। দেশের ইতিহাস বলে, যে কোনো সামরিক শাসক ক্ষমতা গ্রহণ করলেই প্রথম আক্রান্ত হয় আওয়ামী লীগ। কারণ আওয়ামী লীগ জনগণের রাজনৈতিক দল। এ সময় জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগকে ভাঙার কৌশল নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ থেকে অনেকে বেরিয়ে গিয়ে অনেকে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। ১৯৮৬র নির্বাচনে মিডিয়া কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করেছিল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি। কিন্তু জাতীয় পার্টি এখন আওয়ামী লীগের একটি লেজুড়
ছাড়া আর কিছুই নয়। মহাজোটের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রশংসা করা এবং গৃহপালিত বিরোধী দল হিসেবে কাজ করাই জাতীয় পার্টির প্রধান রাজনৈতিক ধর্ম। এভাবেই আওয়ামী লীগের প্রবল প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলটি আওয়ামী লীগের একান্ত অনুগত রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।

শুধু এই কয়টি রাজনৈতিক দল ছাড়াও প্রচন্ড আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক দল বিলীন হয়ে গেছে বা কেউ কেউ আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে। ৭৫ এর ১৫ আগসটের আত্মস্বীকৃত খুনিদের দল ফ্রিডম পার্টি বা ডেমোক্র্যাটিক লীগের মত দলগুলো বিলীন হয়ে গেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কট্টর সমালোচক চীনপন্থি দলগুলো, সাম্যবাদী দল, ওয়ার্কার্স পার্টি এখন আওয়ামী লীগের গভীর মিত্রে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাই একটা অদ্ভুত বাস্তবতা যে, যে রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগের যত বেশি প্রতিপক্ষ হয়েছিল সেই রাজনৈতিক দলগুলো এখন ততটাই দেউলিয়া, নিঃস্ব হয়ে গেছে। হয় তাদেরকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে রাজনীতি করতে হচ্ছে অথবা সেই দলগুলোই বিলুপ্তপ্রায়।